Wednesday, November 20, 2019

নেহাতই গল্প, সত্যি নয়

নাহ্, এবার ঘর থেকে বেরোতেই হবে, বহুদিন বেরোনো হয়নি। সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে কবে থেকে একটা ঘরে বসে পড়ে চলেছে রবি। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। পাড়ার লোকে আড়ালে হাসাহাসি করে, এককালের সেরা ছাত্র এখন বাড়িতে হাঁস হয়ে বসে আছে। বলুক, একদিন সময় পাল্টাবে।তাদের কোম্পানির সবাই জানে কেন রবি চাকরি ছেড়েছিল। সেদিনটা এখনো মনে পড়ে রবির, অনেক-কিছু অনেকভাবে হতে পারতো হয়তো মেয়েটার সাথে, কিন্তু হয়নি। আর ওখানে মন টিকছিলনা। তাই Engineering এ নিজের লাইনের চাকরি পেয়েও ছেড়ে দিয়ে IAS পরীক্ষা দিচ্ছে।যদিও এটা প্রথম নয় রবির, তবুও মেনে নিতে মন চায়না।সে ভেবেছিল আর কাউকে সে ভালোবাসতে পারবেনা, তবুও এল। অনেক ভয়, অনেক সাবধানে এগিয়েছিল রবি। কিন্তু হঠাৎ করে সে যখন আলো দেখিয়ে চলে গেল, সেই অন্ধকার সে আর মেনে নিতে পারলনা। সাইকেলটা নিয়ে নদীর ধারে চলে এল। রোদটা এখনো পড়েনি। কিন্তু হাওয়াটা এত ভালো দিচ্ছিল যে দিব্বি রোদে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। কতদিন মদ খায়নি। একটু মদ হলে বেশ ভালো হত। তার বন্ধুর অভাব নেই। ইচ্ছে করে ফোন করে কিছু বন্ধু মিলে কাছেপিঠে কোথাও একটু যদি ঘুরে আসা যেত, মনটা অনেক হালকা হত। না, তার লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।সূর্যটা অনেকটাই তখন নিস্তেজ হয়ে এসেছিল। রবি সাইকেলটা ঘোরালো। আবার নতুন উদ্যমে শুরু করতে হবে পড়া।
"এই রাস্কেল ! "
একটু অন্যমনস্ক ছিল রবি, আর একটু হলে ধাক্কা লাগত গাড়িটার সাথে। দোষ তারই।সেই লক্ষ্য করেনি। আসলে এত সরু রাস্তায় সাধারণত চার চাকা খুব কম আসে। যাই হোক, সরি বলল রবি গাড়ির চালককে।
গাড়ির চালক তবুও থামল না। আরো কিছু সাধু শব্দ প্রয়োগ করতে যাচ্ছিল রবিকে লক্ষ্য করে, এমন সময় গাড়ির পাশের সিটে বসে থাকা একটা হাত পাশ থেকে তাকে থামালো। রবি চেয়ে দেখল।
না, না এ কি করে সম্ভব ?
তাকে দেখেই চোখ নামিয়ে নিল অমৃতা।
চালক আর কিছু না বলে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল। আর হঠাৎ করে নিজেকে হারিয়ে ফেলল রবি। অমৃতা। সেই বৃষ্টিভেজা কোলকাতার রাস্তা। রাস্তা পেরোতে খুব ভয় পেত। বাজে বকতে খুব ভালোবাসত।রবি একসময়ের অক্সিজেন ছিল অমৃতার।তারপর.....
রবি দেখল সে নদীর পাড়ে কখন সন্ধ্যে নেমে এসেছে।
সবাই এক...সবাই... বিড়বিড় করতে করতে সাইকেলে উঠে বসল সে।।

যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল

আরো কিছু ধুলোবালির মিছিল এসে যোগ দিল মেঘটাতে। বিদ্যুৎপূর্ণ স্লোগান মেঘে গর্জে উঠল প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। আর নিয়ন্ত্রণ রইলনা। জলকণাগুলো সদলবলে আছড়ে পড়লো পলাশের বাড়ির কাছে। কারেন্ট নেই। অগত্যা গিয়ে জানালার কাছে বসল সে। এটাই সুবর্ণ সুযোগ মনকে আনাড়ি হতে দেওয়ার। বৃষ্টির কোয়ান্টামগুলো যেন ঝড়ের কাছে শক্তিসঞ্চয় করে নিজেদের মধ্যে পাঞ্জা লড়ছে।সামনে কাগজকুড়ানির ছেলেগুলো লাফালাফি করছে কাদায়। খুব লোভ হচ্ছে। দু:খ কি ওরা জানেনা। এদের জীবনটাই সংগ্রাম। তাই এদের আলাদা করে লড়তে হয়না। আচ্ছা পলাশ যদি আদিম মানুষ হত, এই ঝড়বাদলে সে কোথায় লুকাত?? তখন কারন্ট নেই, এই ইঁট-কাঠ-পাথরের ইমারত নেই। কোথায় লুকাত? মনে মনে আদিম মানুষকে প্রশ্ন জিগ্যেস করল সে।
'হ্যাঁগা, বৃষ্টি হলে তোমরা আশ্রয় কোথাও নাও? নারকেল গাছ নাকি বটগাছ? তোমরা ভিজে যাওনা? ভিজে গেলে তোমাদের সর্দি-জ্বর হয়না? '
আদিম মানুষ বলল - 'প্রকৃতি ঝড় দিয়েছে সেই বৃষ্টিতে দল বেঁধে নাচার জন্য, গাছের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ঝড় থামার জন্য যারা অপেক্ষা করে, তাদের ঝড় কখনো থামেনা।'
অনেক্ষণ বসে ছিল এভাবে। শেষে গেট খুলে, এগোল ওদের কাছে। উল্লাস হলে মুখ থেকে যে শব্দ বেরোয় তারা শ্রেণীবিভাজন মানেনা। বর্ষা আজ তার প্রেমিকা। চরম আবেগে সে তার শরীরের প্রতিটা অংশে চুম্বন এঁকে দিচ্ছে। কতযুগ আলাদা থাকার পর বর্ষা আর আদিম পলাশের মিলন হল। সে অনুভব করছে তার ঠোঁটে যে বর্ষা আছড়ে পড়ল সেটা তার স্নায়ুকোষে একটা প্রবল তরঙ্গ তৈরি করল তারপর সে সোমাটোসেন্সরি এরিয়া-১ এ পৌঁছাল। এর পরেই সে ঢুকবে এরিয়া-২ এর ইন্টারভিউ বোর্ডে। সেখানে পাশ হলেই সে হিপ্পোক্যাম্পাসে স্থায়ী চাকুরী পাবে। পলাশ আর তার চোখ সেদিন বৃষ্টিতে ভেজেনি, মিশে গেছে।

চেনা ছকে ফেলোনা....

সৃজিতের সংগে দেখা করতে এসেছে প্রমথেশ। নামটা শুনতে বড়। তাই তার ব্যান্ডের ফ্যানেরা তাকে ছোট করে প্রোমো বলে ডাকে। ব্যান্ডের লিড সিংগার।প্রচারের আলো যেরকম, সব দায়িত্বও তেমনি তার ঘাড়ে। ব্যান্ডের লাইফস্টাইল আর ভালো লাগছিলনা। প্লেব্যাক সিংগার হতে চায় সে। তাই সৃজিতের সংগে দেখা করতে আসা। সৃজিত তখন আউটডোর শুটিং এ ব্যস্ত। ব্যান্ডের অন্য মেম্বাররা শুটিং দেখতে গেল। হইচই ভালো লাগেনা তার। দূরে একটা বটগাছের তলায় পুকুরপারে বসল সে। অনেক্ষণ চুপচাপ বসে কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ পাশে এসে কে দাঁড়ালো আর একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ।
- বসতে পারি ?
ফিরে দেখল এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
- না তো বলতে পারিনা। এটা ওপেন প্লেস।
সে উত্তর দিল।

- মানে !!! নাহলে কি না বলতেন ?
- এখন তো বলছিনা। দাঁড়িয়ে না থেকে আপনি বসুন না !!
- ভেবেছিলাম একদম অভদ্র, সেরকম নয় তাহলে।
- যার কাছে ভদ্রতার সংজ্ঞা যেরকম।
- কিরকম ?
- ধরুন, একজন খুব গভীর কিছু ভাবছিল, আপনি তার কাছে গিয়ে বললেন - 'এক থা টাইগার' দেখতে যাবেন ? সে যদি তখন ভদ্র আচরণ করে সে তাহলে নিজের সংগে অভদ্রতা করবে।
- বুঝলাম, তো আপনি কি গভীর ভাবছিলেন শুনি ?
- এই যে ধরুন, এই পুকুরপাড় কি জানে, এর ধারে কাছে সৃজিত সাহেব শুটিং করছেন । জানলে এও নিশ্চয়ই শুটিং দেখতে যেত। (মেয়েটি হেসে উঠল)
না না হাসবেন না। কি ভয়ানক ব্যাপার বলুন তো, তখন আর এই পুকুরের জলে আকাশ দেখতে পেতাম না। রাতের বেলা হয়তো কোন প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চাঁদ হিসেবে কল্পনা করত, পুকুরে পড়া চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখে, সেটাও হতনা। সে ফোন করে বলত তার প্রেমিকাকে, আজ আলু, টম্যাটো দেখেই তোমার কথা মনে করতে হল।
মেয়েটি খিল খিল করে হেসে উঠল।

- আপনি তো খুব রোমান্টিক মানুষ। কি করেন, কবিতা -টবিতা লেখেন নিশ্চয়ই।
- কি যে বলেন, আমি একজন মধ্যবিত্ত বাঙালি। আর
সব বাঙালি মা 'র পেট থেকে বেরিয়েই কবিতা লেখা শুরু করে।এভাবে লজ্জা দেবেন না।
- আরে না, সত্যি বলছি। আমি আপনার মত রোমান্টিক কথা কারো মুখে শুনিনি। শেক্সপিয়ারের ফ্যান বুঝি ?
- আজ্ঞে না। আমি একটি ব্যান্ডে গান গাইতাম।এখানে এসেছি সৃজিত সাহেবের কাছে কাজের খোঁজে। আমার বন্ধুরা গেছে শুটিং এর কাছে। আপনার পরিচয় জানা হলনা।
- আমি এই সিনেমার যে আজকের ক্যামেরাম্যান, তার ভাইঝি। শুটিং দেখতে এসেছিলাম। বাট্, খুব বোর হয়ে এদিকে এসেছি। এদিকটা ফাঁকা।
- কোথাও ফাঁকা নেই, এখানে এসেও দেখলেন একজন ভিখারি বসে আছে।
- ভিখারি !! আপনাকে দেখে তো শিক্ষিত মনে হয়। কোন কলেজ ?
- এন.আর.এস., ফাইনাল ইয়ার।
- ডাক্তার !
-দুর্ভাগ্যক্রমে !! আপনি ?
- আমি যাদবপুর ফিলোজফি সেকন্ড ইয়ার। ফিল্মের অফার পেয়েছি, বাট্ এখনই নামতে চাইনা।
এই সময় হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল প্রমথেশের।
-সৃজিত সাহেবের শুটিং শেষের পথে, আমি তবে আসি।
- আপনি কিছু ভুলছেন না তো ? ( মুচকি হেসে মেয়েটি জানতে চাইল)
- পৃথিবীটা গোল, যদি আবার দেখা হওয়ার হয় নিশ্চয়ই হবে, নাম, ফোন নাম্বার না জানলেও চলবে।

এই বলে প্রমথেশ চলে গেল। মেয়েটি হাঁ করে রইল তার দিকে।এরকম ছেলে সে কখনো হয়তো দেখেনি।
তারপর মনে মনে ভাবল - ধুস্, পাগল একটা !!!

খোলা জানালা

বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু নীল মেঘটা এমন সুন্দর ভাবে রোদকে ঢেকে রেখেছে যে মনে হচ্ছে হাল্কা করে চোখটা বুজে শুয়ে থাকতে। উপরের কার্নিশ থেকে একটা জলের ফোঁটা পড়ল বড় কচু পাতাটার উপর। পাতাটা যেন ক্যাচ লুফে নিল ফোঁটাটাকে, তারপর ঝিনুকের মত অহংকার নিয়ে জলের ফোঁটাটাকে মুক্তার মত সাজিয়ে রাখল। জানালার এপাশ থেকে এসব দেখছিল পৌলমী। সামনে তার সেমিস্টার।পড়তে কি সবসময় ভালো লাগে ! হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল তার। অমিত ফোন করেছে। তার নতুন বয়ফ্রেন্ড। আবার শুরু হবে সেই গতানুগতিক ডাল-ভাত মার্কা কথা। তারপর শেষপাতে মিষ্টি চাইবে বয়ফ্রেন্ড। সবই জানা।ফোনে কথা বলে মুডটাই নষ্ট হয়ে গেল তার। সব ছেলেই এক।প্রথম প্রথম কত রোমান্টিক, তারপর সব সেই একই ডাল-ভাত। পৌলমীর বন্ধুরা তাকে দোষ দেয় সে কারো সাথে স্টেবল হতে পারেনা। কিন্তু কি করবে সে ? যদি কাউকে ভালো না লাগে ? ভালোবাসা না ছাই! কেউ পারবে তাকে তার বাবার মত ভালোবাসতে। বাবার কথা না শুনলেও ভালোবাসা কমেনা। পারবে কেউ ? সবাই তো বয়ফ্রেন্ড হয়ে নিজেকে গার্লফ্রেন্ডের বিধাতা ভেবে নেয়। যেন প্রতি পদক্ষেপের জবাবদিহি চাই। সেও যদি কলেজের বাকি মেয়েদের মত নেকুপুচু টাইপের লাইফস্টাইল লিড করতে পারতো তাহলে এত ব্রেক-আপ করতে হতনা। এখনকার গল্প-উপন্যাস-সিনেমা সব একই কথা বলে, মেয়ে যেন পণ্য। সবসময় জানু -সোনা-মনা করবে নইলে ধোঁকা দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবে। সব সেই একই গল্প। তার বাইরেও তো কেউ থাকতে পারে।
মেঘটা হঠাৎ ডেকে উঠল, সে ছুট্টে গিয়ে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল ঘর অন্ধকার করে। তারপর তার নিজের দুনিয়ায় সে হারিয়ে গেল। এর থেকে সেই পাগলটাই ভালো ছিল। ওকে বলেছিল - 'দিনের বারো ঘন্টা মনে হয় কমিটেড থাকি, বারো ঘন্টা মনে হয় সিংগেল থাকি।কিন্তু দুটো একসাথে সম্ভব নয়। ' পাগলটার কথা তখন বুঝতে পারেনি।এখন মাঝে মাঝে ওকে খুব রোমান্টিক লাগে। এটা বুঝতে পারে, ওর সংগে থাকলে জীবনকে কখনো ডাল-ভাত হতে দিত না। হয় বিরিয়ানি নাহয় খালি পেট। এদের সংগে হয়তো কিছু সময় কাটানোই ভালো, জীবন কাটানোর জন্য নয়। আর কিছু পালটানো সম্ভব নয়। অনেক অপমান করেছে ওকে, অনেক বোঝানোর পরেও ফিরে যায়নি, আর ওকে ফেরানো সম্ভব নয়। 'আর একবার ডাকছনা কেন তুমি আমায় ? ' পৌলমীর প্রাণ কেঁদে উঠল। 'আর একবার ডেকে দেখ, আমি তোমায় খুঁজছি।' চোখটা ভিজে গেল পৌলমীর। হঠাৎ হোয়াট্স্যাপে মেসেজ এল -
'খেয়েছ জান ? '
মুখে হাসি ফুটে উঠল পৌলমীর। এ সত্যি ভালোবাসে ওকে। কিন্তু বেশি ভালোবাসা গা-সওয়া হয়ে গেছে। ওর কিছু পাগলামি পেতে ইচ্ছে করছে। ফেসবুক খুলে সার্চে গিয়ে নামটা টাইপ করল। প্রোফাইলটা ক্লিক করতেই একটা হাসি মুখ ভেসে উঠল। কি আছে এর ভেতরে। একে এত কষ্ট, অবহেলা দিয়েছি তবু হাসছে কি করে ওভাবে ?
কি একটা ফটো পোস্ট করেছে। এত বড় হল ছেলেমানুষি গেলনা! উফ্। ওকে একদিন বলেছিল - তোমায় যে বিয়ে করবে খুব সুখী হবে।
নির্লজ্জের মত উত্তর দিয়েছিল - নিজের সুখকে হিংসে হচ্ছে ?
শয়তান একটা। ভালো শয়তান।
ওকে ছেড়ে আসার পর একটাও খারাপ কথা লেখেনি, অন্য ছেলেরা হুমকি দেয়, আসিড ছুঁড়ে মারার কথা বলে।
ফোনে বয়ফ্রেন্ডের মেসেজ এল - কথা বলছনা কেন ? ব্যস্ত ?
একটু পরে আবার ফোন এল। কেটে দিল ফোনটা। ফেসবুক বন্ধ করে জানালার পাশে দাঁড়াল। একটা গান গেয়ে শুনিয়েছিল পাগলটা - 'খোলা জানালা।' শুয়ে পড়ল সে। ঘুম আসছেনা কেন তার হঠাৎ ??

মাঝরাতের ডায়েরিটা

 একজন ফরেস্ট অফিসারের কাছে ওর নাম্বার পেয়ে যাচ্ছি দেখা করতে। শালা আমরা এখানে টাকা-ফ্ল্যাট-গাড়ির দৌড়ে এখনো দৌড়ে বেড়াচ্ছি। মালটা নাকি কোন জংগলে লাস্ট সাত-আট বছর পড়ে আছে। অথচ আমাদের মধ্যে সব থেকে বেশি সোফিস্টিকেটেড লাইফস্টাইল ছিল ওর। ইন্টার্নসিপেই বলত এই চাকরের লাইফ ভালো লাগছেনা। দেখবি আমিও একদিন বস হব। আমার অনেক গাড়ি, ফ্ল্যাট থাকবে। সেইদিকেই যাচ্ছিল। সেলিব্রিটি লাইফস্টাইল থেকে হঠাৎ বিবাগী হয়ে গেল। হঠাৎ মানুষের কি যে হয় !! যে সবসময় প্রচারের আলোতে থাকত, সে আজ কেন অন্ধকারে চলে গেল এটা ওর কাছে গেলেই বোঝা যাবে।

২৫/১/২০২৮, সকাল ১০ টা

আমি এখন ওর ছোট্টো বাড়িতে উঠেছি। ছোট্টো বাড়ি, কিন্তু খুব যত্নে সাজানো, অবশ্যই বৌদি মানে ওর বউ এর হাতযশে। সামনে যেদিকে তাকানো যায় জংগল। সকাল দশটা, তবু কুয়াশার যেন ঘুম ভাংগেনি । বৌদিকে নিয়ে বলতেই হয় কয়েকটা কথা। একদম পারফেক্ট ম্যাচ,কোথা থেকে খুঁজে পেল কে জানে। আমি সকালে উঠে চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম- তোমার শাড়ি, গয়নার দরকার হলে কি কর ? এখানে আশেপাশে তো দোকান আছে বলে মনে হয়না।
বলল - আমার যা আছে বেশি আছে। এখানে গাছ পালারা এসবের কিছুই বোঝেনা। আর তোমার বন্ধু মনে হয় আমায় এভাবে দেখতেই বেশি পছন্দ করে। তাই দরকার হয়না।
যেমন বন্ধু, তেমনি তার বউ। মালটাকে বললাম, আমি এসেছি, আজকের রুগী না দেখলেই নয়। বলল - এখানে প্রাথমিক চিকিৎসক এরই বড় অভাব ভাই। একদিন না গেলে আমার হয়তো কোন ক্ষতি হবেনা। তবে এদের খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।
মালটা সেন্টু মাল ছিল জানতাম, হঠাৎ গাড়ি-বাড়ির চিন্তা ছেড়ে এরকম ফিলান্থ্রপিস্ট হয়ে গেল কবে থেকে কে জানে। তবে একটা কথা ঠিক, এখানকার পরিবেশ খুব মনোরম।

রাত ১২ টা

আজ যা হল, ভেবেছিলাম মনেই রেখে দেব। লিখে মনের ভাব প্রকাশ সম্ভব নয়। কিন্তু ডায়েরিতে না লেখা অবদি শান্তি হচ্ছিলনা। ঘুম আসছিল না। লিখে রাখি। আমার পরবর্তী প্রজন্ম এটা পড়ে যাতে আমার ভুল না করে। আজ বন্ধু খাওয়ার পর বলল চল তোকে আজকে স্বপ্ন-রাজ্যে নিয়ে যাব। আমি ভেবেছিলাম বাতেল দিচ্ছে। কিন্তু যা দেখলাম, লিখে বর্ণনা করার মত সাহিত্য আমার আসেনা। সহজ ভাষাতেই বলছি। ওর বাড়ির পিছন দিকে দশ মিনিট হেঁটে গেলে জায়গাটা পড়ে। একটা হ্রদ, পাড়টা বাঁধানো। হ্রদটা বেশ বড়। হ্রদটা ওপারে শেষ হতেই পাহাড় শুরু। রাত্রিটা ছিল পূর্ণিমা রাত্তির। আমরা চুপচাপ পাড়ে বসে রইলাম। চাঁদের আলোর ঘন কুয়াশায় বিচ্ছুরণ হচ্ছিল, আর সেই বিচ্ছুরিত আলো আমার নাগরিক চেতনাকে উদ্ভাসিত করে দিচ্ছিল। হতবাক হয়ে চেয়েছিলাম, পাহাড়ের খাঁজে চাঁদ এর দিকে। দূরে কোথাও থেকে হাতির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম।
আর হ্রদের অন্য দিকটাতে এক পাল হরিণ চাঁদের আলোয় জল খাচ্ছিল। কি করলাম সারা জীবন। এত টাকা দিয়ে শুধু কৃত্রিমের সাধনা করে গেলাম। নতুন গাড়ি কিনে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করলাম। বদলে কিছু ইগো স্যাটিসফাইং লাইক। হঠাৎ বন্ধু বাঁশি বাজানো শুরু করল। শীতের হাওয়া, হাতির ডাক, আর সেই বাঁশির শব্দ যেন একসাথে অনুরণিত হতে লাগল। বৌদি বন্ধুর গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজলো। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। যেন সামনে আমি এক অলৌকিক সুখ কে উপলব্ধ হতে দেখছি। ছোটবেলা থেকে সমাজ শিখিয়েছে যার বাড়ির গেটে ঢুকতে যতগুলো কুকুর তাড়া করে, যতগুলো দারোয়ান ঘাড়ধাক্কা দেয়, প্রয়োজনের তুলনায় যার গাড়ি বেশি, বাড়িতে থাকার জায়গা, ফ্রিজে রাখা খাবার বেশি, আলমারিতে রাখা পোশাক- পরিচ্ছদ বেশি তারাই আসল বড়লোক। আজ তো সব ধারণা কেমন যেন উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। না,না, কিচ্ছু চাইনা। শান্তি চাই।মনের দুর্ভেদ্য অরণ্যের গভীরতম গুহায় লুকানো সেই শান্তি চাই।আর কিচ্ছু নয়। এই পরীক্ষাটা পাশ করলে লোকে সাবাশি দেবে।এই গাড়িটা কিনলে লোকে হিংসে করবে। সারা জীবন যে ধন-খ্যাতির মোহ র পিছনে এভাবে ছুটেছি আজ সব বৃথা মনে হচ্ছে। মন লোকের কথায় শান্তি নয়, আজ নিজের শান্তি চাইছে। ধন্যবাদ বন্ধু। আমার জীবন বদলে দেওয়ার জন্য। ডাক্তারবাবু আজ দুধ-সাদা রঙের ফেরারি নয়, নীল-সাদা আকাশ চায় ।।

অন্যভাবে

-মা-র শরীর খারাপ, পাশের ঘরে শুয়ে ছেলে স্ট্যাটাস আপডেট দিয়েছে - মা, সুস্থ হয়ে ওঠো। সেখানে অনেক লাইক। কমেন্টে কাল কি সিনেমা রিলিজ করবে তাই নিয়ে আলোচনা। অথচ পাশের ঘরে গিয়ে ছেলে একবারও দেখতে যেতে পারছেনা। মেসেঞ্জারে ব্যস্ত।
-রুগী বিছানায় শুয়ে আছে, বলছে তার কষ্টের কথা, ডাক্তারবাবু হোয়াটস্আপে আপডেট দিলেন- ইন রাউন্ড।
-ফোটোতে কমেন্ট পড়ছে - তুই আমার সব থেকে প্রিয় বন্ধু। অথচ জানেও না তার সেই প্রিয় বন্ধু এখন কোথায় ?
-সবথেকে হাস্যকর হল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। কাউকে হয়তো সহ্য করতে পারেন না। অথচ দিব্যি তারা একে অপরের ফ্রেন্ডলিস্টে তিল আর আঁচিল এর মত সহাবস্থান করছে।
এটাই হল সোশ্যাল নেটওয়ার্ক। বেশি সামাজিক হতে গিয়ে, সত্যি সামাজিক হচ্ছি কি? নাকি ভার্টুয়্যাল দুনিয়ার গ্রাসে নিজেকে বলি করছি। কাছে আসতে গিয়ে আমরা আরো দূরে চলে যাচ্ছি। বলছি এক, বুঝছে আর এক। একটা দিন আসবে, যখন, বাবা-মা রা ছেলে দের টাইমলাইনে নিজেদের ফটো পোস্ট করে বলবে - if you remember this , your childhood was awesome...
ছোট থেকে ফেসবুক ম্যানেজমেন্ট এর জন্য আলাদা একটা সাবজেক্ট পড়ানো হবে। তার একটা চ্যাপ্টার হবে কিভাবে ফেসবুকে লাইক বাড়াবেন !!!
এটি একটি বিজনেস পলিসি। এর জন্য আলাদা টিউশানি নিতে হবে। কেউ সৎ, কেউ অসৎ পথে লাইক বাড়াতে শেখাবে। সৎ পথে লাইক বাড়াতে হলে আপনাকে সামাজিক আচরণ করতে হবে। মানুষটিকে ব্যক্তিগতভাবে যেরকমই লাগুকনা কেন/ চেনা হোক বা অচেনা তার ফটোতে, কমেন্ট বা মিনিমাম লাইক দিতে হবে। ভবিষ্যতে তারাও দেবে। গিভ আন্ড টেক পলিসি। সবার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করতে হবে। আপনার কোনকিছু পোস্ট করব মনে করলেই যখন খুশি পোস্ট করতে পারেন না। পিক আওয়ার দেখে পোস্ট করতে হবে। খুব সহজ হিসেব - আপনার ফ্রেন্ড সংখ্যা যদি হাজার এর উপরে হয়, আপনার যেকোন ছবিতে ১০% এর হিসেবে ১০০ লাইক থাকতে বাধ্য। আপনার ইগো তখন পুষ্ট হবে।ছোটবেলায়একটা গান শুনেছিলাম -' খিড়কি থেকে সিংহ-দুয়ার এই তোমাদের পৃথিবী, এর বাহিরে জগত আছে তোমরা জানোনা। '
গানটা অন্ত্যাক্ষরী খেলাতে খুব কাজে লাগত। যেহেতু 'খ' দিয়ে শুরু গান খুব কম।
সত্যি আমরা সামাজিক হচ্ছি ?
একবার লংড্রাইভে গিয়ে দেখুন না, নদীর পাড়ে হাল্কা আওয়াজে রবিশংকরের সেতার শুনতে শুনতে সূর্যাস্ত দেখুন। হাইওয়ের ধারে ওই যে ঝোপঝাড়ে জংলি ফুল গুলো ফুটেছে ওদের গায়ে অনেক প্রজাপতি বসে, ওদের একজনকে ধরে এনে আপনার প্রেমিকার হাতে দিন। হ্যাঁ,কোন কে.এফ.সি তে গিয়ে সেল্ফি তুলে পোস্ট করার থেকে এটা ঢের বেশি রোম্যান্টিক। একবার ওই ভার্চুয়্যাল দুনিয়া থেকে বেরিয়ে এসে দেখুন, আসল দুনিয়া টা অনেক রঙীন আর সুন্দর। যেখানে বন্ধু রিক্যোয়েস্ট ছাড়াই হয়। যত খুশি বকুন, কোন ক্যারেক্টার লিমিট নেই। একটা ষাঁড়ের লড়াই দেখতে স্ট্রিমিং এর ঝামেলা পোহাতে হয়না। খেলুন, হাসুন, গান গেয়ে বেড়ান রাস্তাতে। কেউ আপনাকে ব্লক করবেনা। আপনার চোখ, আর কান ছাড়াও আরো তিনটে ইন্দ্রিয় আছে। সোশ্যাল মিডিয়া এগুলোর চাহিদা মেটাতে পারেনা। চলুন এবার একসাথে বৃষ্টি ভেজা যাক। চলুন না একবার, মানস সরোবর ঘুরে আসি।
সত্যি কি আমরা সামাজিক হচ্ছি ?

এক মুঠো ঝিনুক

যেভাবে সেই জ্যোৎস্নাময় রাতে তুমি ইভ হতে চাইলে,/
আমার কাছে কিছু বোবা ভালোবাসা ছিল,/
যেভাবে তুমি সেই নির্বাক ছবিতে প্রাণ নিয়ে এলে,/
আমার কাছে কিছু ছাইচাপা আগুন ছিল,/
যেভাবে তুমি অনাবিল হাসি নিয়ে এলে,/
আমার কাছে কিছু আগাম স্বপ্ন ছিল ;/
যে স্বপ্নে ব্যবধান মুছে ,/
ভুলে যাব দুনিয়ার প্যাঁচ পয়জার,/
খুলে অবচেতনের দ্বার- ,/
তারাদের দেশে জ্যামিতি শেখাব,/
তুমি শুধু চোখ খোলা রেখো,/
সেচোখে নতুন উপপাদ্য নামুক,/
হাসির বৃষ্টি নিয়ম ভেঙ্গে সে রংগের জৌলুষ বাড়াক, /
তোমার কথার ভাঁজে খুঁজে নেব যত কথা - /
না বলা আমার,/
চুল বাঁধন হারাক ,/
প্রতিবার,/
আসুক আগামীর সংবাদ ।।
*****************
সে চোখের সিঁড়ি বেয়ে ভাঙা অলিন্দে জোয়ার নামে,/
দৃষ্টি তোমার অভিকর্ষে অবাধে পতনশীল। /
এভাবেই হেঁটে যাক নির্বাক কথার মিছিল,/
শীতঘুমে তোমায় দেখতে থাকি।/
নরম আঙুলে হঠাৎ সম্বিত ফিরে আসে,/
ভেজা শিশির ঠোঁটে নিয়ে স্থির চোখের তারায় অস্থির-/
একমুখী চেতনা আমার।/
একের পর এক স্খলিত ব্যারিকেড, /
যেন আয়নায় তাড়া করে প্রতিবিম্বকে ।/
অনেক যুগ আগে কোন ভাস্কর্য শিল্পও, /
সেই সংবাদ বোঝে। /
আর সৃষ্টি যেভাবে হয় ধ্বংসের খোঁজে, /
সভ্যতা সেখানে করে শিলালিপির সন্ধান । /
তুমি আমি সেই কালের কাছে খুব ছোট,/
ইতিহাস হয়ে যাব হয়তো বা একদিন,/
তাই এই ভূগোলে আজ ভ্রূণ রেখে যাই।।

************

যারা সব কিছু হারিয়ে ফেলে,/
তারা আর আশা নয়, ভালোবাসা চায়।/
যেসব রাতে তারা চুপচাপ বালিশ ভেজায়,/
সেইসব আঁধার কালোয় তারা চায় শুধু আলো, /
যদি আলো না হতে পারো,/
তাহলে কেন দাও আশা।/
তার সব কিছু জানলে, /
দিতে পারো কি একটু ভালোবাসা ? /
তার স্বপ্নে যখন লাল-নীল-সবুজ মিশে যায়,/
সেই স্বপ্নের রংগে একবার ভিজে দেখো,/
যারা হারিয়েছে, তারা সহজে হারাতে দেয়না।।

***********
এভাবে যেওনা চলে,/
অনেক গল্পগুলো মিঠেকড়া বোলে,/
অনেক স্বপ্নগুলো ধরতে যাওয়া বাকি,/
অনেক অচেনা পথ পায়ে পায়ে,/
অনেক অম্ল-মধুর সুরের লয়ে,/
অনেক সুখের দুখের সময়গুলোয়
গান শোনানো বাকি,/
হঠাৎ আমায় একলা ফেলে,/
এভাবে যেওনা চলে।।

*********

আমায় কেউ মনে রাখুক,/
আমি চাইনা।/
আগে চাইতাম,/
এই প্রবল প্রাণ,/
পৃথিবীর সব দিকে স্মৃতি রেখে যাক/
এখন চাইনা।/
সিগ্রেট চলে,/
বিষ দিয়ে চলছে নিজেকে মারার ধীর প্রক্রিয়া। /
তবু যখন কেউ নেই,/
সে অসময়ে সাথী।/
এভাবেই যেকটা দিন বাঁচিয়ে রাখে,/
শেষ দিন আসুক ঘনিয়ে,/
আসলে কেউ কাউকে মনে রাখেনা,/
তাই কেউ মনে রাখুক,/
আমি চাইনা।।

********

সব শেষ বলে যেখানে তুমি আঁধার দেখ,/
সেখানেই আসলে আসল শুরু। /
তোমার জীবনটা নিছক একটা জীবন,/
কারো মত নয়।/
না উপন্যাস, না সিনেমা। /
একে শুধুমাত্র জীবন হিসেবে নাও।/
এভাবেই বাঁচতে শেখো।/
এ পৃথিবীতে সবাই কষ্ট পায়,/
কবিতা লেখে।/
দিনের শেষে তুমিও কিন্তু সবার মতই-/
জল খেয়ে ঘুমাতে যাও।/
তুমি ভিনজগতের নও, /
এ জগতেই বাস তোমার,/
সবার মত তোমার দুনিয়ায় রোজ একবার করে সূর্য আসে আর চলে যায়।/
সাধারণ হয়ে বেঁচে থাকাও একটা অসাধারণ কাজ।।/
আমার একটা আলো চাই/
স্নিগ্ধ আলো,/
আকাশের যত নীল চোখে এনে,/
দম ভরে দেবে ফুসফুসে।/
আমার একটা আলো চাই।/
যার হাত সব চোখের জল মুছে দেবে,/
জীবনের যত গ্লানি,/
যত ব্যর্থ ফলাফল,/
এক লহমায় পাঠাবে কোন ভুলে যাওয়া স্নায়ুকোষে।/
আমার একটা আলো চাই।/
যেটা শুধু ভালো পথ দেখাবে, /
শব্দ যখন পথভোলা পথিক হবে,/
সে তখন হবে দিশা।/
আমার একটা আলো চাই,/
যার সাথে পেরিয়ে চৌকাঠ/
হেরে গেলে ক্ষতি নেই,/
সে স্বপ্ন দেখাবে আবার ফিরে আসার,/
আমার একটা আলো চাই,/
প্রতারিত এই প্রাণ যখন মাতাল হতে চাইবে,/
তার চোখে চোখ রেখে মদের বোতল ভাঙব আমি,/
আমার একটা আলো চাই,/
যার হাতে হাত রেখে-/
অন্ধকার কে আর কালো মনে হবেনা।।

***********

চারমাত্রার একঘর 'পরে,/
কানপেতে শুনি আমি/
তোমার অভিমান।/
আর কাঁচাহাতে প্রজাপতি ধরা,/
সবই কোন দূর বলাকার সাথে মিশে যায়।/
ইলিশে গুঁড়ি সুর বয়,/
তোমার দুহাতে সেই প্রাচীন ভয়।/
ধীরে নামে কুয়াশার জাল,/
আর নীল আলোর বিচ্ছুরণ-/
সান্দ্র প্রেমে যেন আলোড়ন এল।/
আবার এসেছ ফিরে, /
ছলনার বেশে তুমি,/
নির্মেদ ঘুমের ঘোরে রক্তাক্ত প্রেমভূমি।/
আঁখিপট রিখটার স্কেল খোঁজে বারবার।/
কি দারুণ সে ব্যথা তোমার-আমার।।
চারমাত্রার একঘর 'পরে,/
চোখ মেলে দেখি আমি/
কোকিলের ডাক।/
আর খিলখিল হাসি। /
সবই কোন দূর ট্রেনে ধোঁওয়া ছেড়ে বাতাসে মিলায়।/
শরীর শব্দ করে ওঠে,/
ক্ণায় ক্ণায় যেন কামনারা ছোটে।/
প্রতিটি ভাঁজে মেশে দৈবিক সওগাত।/
যেখানে মিশেছে তোমার হাত-/
বাঁধ ভাংগে, জলছবি জেগে ওঠে। /
আবার আসবে ফিরে, /
এইভাবে এলোমেলো বেশে, /
ব্রাত্য করেছ যারে সুখের কোলাহলে,/
এক শিশির সন্ধ্যায় তাকে পড়বেই দেখো মনে।।

*************

একদিন সব মায়া ছেড়ে আমি ঘুমাব,/
আর তুমি দেখবে আমার শরীরকে ছাই হতে,/
তখন কি আমায় ভুলে যাবে? /
নাকি মনে রাখবে- /
শুধু কিছু অবশিষ্ট কার্বন ক্ণা ভেবে? /
নাকি মনে রাখবে কিছু কান্না-হাসির স্মৃতি হিসেবে? /
নাকি কোন এক কল্পনার স্বর্গ এঁকে /
আবার কথা বলতে চাইবে?

**********

এরপর আমি মিলিয়ে যেতে পারি,/
সব চেতনা বলাকার মত যেখানে মিলায়/
একটা শামুকের মত শক্ত খোলসে নিজেকে ঢেকে নিতে পারি,/
তোমরা জেগে থেকো,/
দুনিয়ার কাজে আর মন নেই।।

*********

কলেজের শেষ দিন, /
সেদিন তুই তাকিয়েছিলি /
জ্যোৎস্নাভরা চোখে।/
তারপর- গমগমে ক্যান্টিন/
আমার চোখ খুঁজেছে শুধু/
অবাক হয়ে তোকে।/
একদিন ঠিক ভুলে যাব/
নদীর তীরে উদাস হব/
ডিজিট্যাল চিঠি আমি খুলবনা আর/
স্বপ্ন আমি কফিনে পুরে দেব।/
সেদিন ছিল-/
গল্পের সিঁড়ি ধরে পেরনো উজান/
রিভার্স সুইপে হত তোর হাসির-ই কারণ।/
প্রিয়া তুই এখন, অনেক দূরে এখন।/
স্বপ্ন দেখার কাজ শেষ, /
শুধু পাচ্ছিনা বেতন।/
একদিন ঠিক ভুলে যাব।/
নদীর তীরে উদাস হব।/
ডিজিট্যাল চিঠি আমি খুলবনা আর/
স্বপ্ন আমি কফিনে পুরে দেব।।

********

যে স্বপ্নগুলো আমার সোচ্চার ছিল/
আমি জানি সেগুলো কোথাও তোমার চোখে -/
ফুটিয়েছে ফুল।/
পৃথিবী আঁধার দেখালো,/
আর তার সাথে তুমি এলে আলো,/
শেষে তুমিও বুঝেছ ভুল।/
বুঝেছি নিশ্চুপে,/
ব্যস্ত বিধাতা কিছু পেয়ে অবসর,/
তোমায় পাঠালেন দেবীরূপে,/
অস্ফুটে ব্যকরণ বুঝেছি সেদিন,/
কিছু বলার ছিল, /
আমার কিছু বলার ছিল,/
একলা তোমায়।/
আমি আর কেউ নই,/
যেভাবে চিনেছ আমি তাই।/
জানি কেঁদেছ অনেক।/
একবার যদি ভিজে থাকো,/
বারবার ভিজবে তুমি, /
আজ নয় কাল।/
চাইনি কখনো এটা, /
চাইনি এভাবে শেষ,/
চাইনি এভাবে দূরে চলে যেতে,/
আর একটু সবুর করে নাহয় নিতে,/
যেন এটা ঠিক শেষ নয়,/
চোখের তলা ভিজে আসে,/
হয়তো সেটা শিশির-ই বা হবে।/
তবে জানি,/
সেই আশার বাণী,/
যদি সত্যি চেয়ে থাকো আমায় আড়ালে,/
ফিরে আসবে জানি,/
প্রিয়তমা হয়ে, রাজকন্যের বেশে,/
আমি আবার আমাতে এসে-/
তোমায় হাসাবো।।
***********

প্লিজ ফিরে এসো প্রিয়া,/
অনেক থেকেছো দূরে,/
পৃথিবীটা গোল,/
অনেক ঘুরে সেই আবার পড়ছে মনে,/
প্লিজ ফিরে এসো।/
তোমায় হাসতে দেখে নিজেকে হারাবো,/
পৃথিবীর সব ছায়া ভুলে, /
তোমার সাথে কিছু তারা গুনি,/
প্লিজ ফিরে এসো।/
আমার প্রেমিক মনে, /
তোমার হেঁয়ালি কিছু আগুন জ্বালাক,/
ঘুমের ঘোরে তোমার হোক অভিসার,/
প্লিজ ফিরে এস।/
ফিরে এসো প্রিয়া।।


******


সেদিন ছিল খোলা হাওয়া,
আর আজ -
বৃষ্টি হচ্ছে।
তোমার শ্রুতি-কথনে ব্যথিত সময়,
আর কিছু অভিমানে সিক্ত মাটি -
আজ বৃষ্টি হচ্ছে।।
ঘুমহীন,
রাতের সেদিন,
আজ উপহাস;
তোমার শিলালিপিতে আমি আজ বিস্মৃত ইতিহাস।
আজ আমি-তুমি একেবারে চুপ।
আঁখিকোণ, রয়েছে গোপন, তবু -
আজ বৃষ্টি হচ্ছে।।
তোমার খোলা বেণীর আদর,
আমার নিকানো উঠানে ফের ট্রাফিকের মত জমছে।
চুপ থেকে থেকে মনে পড়ছে অধ:ক্ষেপ,
সে খোলা আকাশের কাছে,
অস্থির চাতকের মত আবেগ চাইছে -
আজ বৃষ্টি হচ্ছে।।
বুকে রক্ত জমছে,
মন আজ স্থির চোখের তারায় অস্থির।
তোমার জন্য জীবন দিতে পারতাম।
আজ কিছু চোখের জলও দেখি দামী।।
আমার শুকনো উপত্যকায় তবু,
আজ বৃষ্টি হচ্ছে।।

পাঁচ মিনিট

"বিষ টা খাওয়ার আগে একবার আমাকে বলতো!! " কথাটা শেষ করতে না করতেই গলা ধরে এলো কিরণ এর। হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এর বাইরে ...