Saturday, September 22, 2018

পাঁচ মিনিট

"বিষ টা খাওয়ার আগে একবার আমাকে বলতো!! " কথাটা শেষ করতে না করতেই গলা ধরে এলো কিরণ এর। হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এর বাইরে চেয়ারে বসে ওই অবস্থায় তার বন্ধু সুমন কে আঁকড়ে কেঁদে ফেললো কিরণ। নিজেকে আটকাতে পারলোনা। পারবেই বা কি করে!  ফিজিক্স এর পিএইচডি স্কলার তিন বন্ধু কিরণ, সুমন আর পলাশ। সেই স্কুল জীবন থেকে বন্ধু তারা। একই কলেজ। একই ইনস্টিটিউট এ পিএইচডি।  কজনের এরকম ভাগ্য হয়। ফিজিক্সের বাইরে তারা কিছুই বোঝেনা। সিসিইউ র বাইরে যখন ডাক্তার এসে বললেন যে
 "তোমার বন্ধুর হার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আমরা চেষ্টা করছি ফেরানোর, কিন্তু আর ৫ মিনিটে না ফিরলে আশা নেই, ৫ মিনিট পরে বলছি। "
 তখন দুজনেই ভেঙে পড়ল। হ্যাঁ, দুজনেই জানে পলাশ কেন বিষ খেয়েছে। মেয়েটার নাম তনুশ্রী । সেই কলেজের প্রেম ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই পলাশ কয়েকদিন এই পুরো অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। সব সময় আলাদা ঘুরে বেড়াতো একা একা, চুপচাপ। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতনা। কিন্তু এরকম যে হঠাত করে বসবে কে জানতো!!?? বেশ কিছুদিন তাদের হস্টেল ক্যাম্পাসে বটগাছের তলায় গাঁজার আসরে আসছিলনা পলাশ। তাই সেদিনও ভেবেছিল, হয়তো আজকেও ওই জন্য আসেনি। তারপর দুজনের প্রেজেন্টেশন ছিল, তার চাপে খোঁজ নিতেও যাওয়া হয়নি পলাশের ঘরে। পরদিন সকালে হঠাত্ পলাশের বাবা ফোন করে বললো মাঝরাতে নাকি পলাশ কি সব মেসেজ পাঠিয়েছে ওর ঘরে গিয়ে খোঁজ নিতে। পলাশের ঘরে তারা গিয়ে দেখে একটা নিথর শরীর পড়ে আছে। শেষ শ্বাস নিচ্ছে যেন।
" পলাশ চন্দ র বাড়ির লোক কে আছেন? "
ডাক্তারের ডাকে দুজন তাড়াহুড়ো করে গেল।
"নাহ্ বাঁচানো গেলনা। "
কথাটা ডাক্তার বলা মাত্রই ডাক্তারের কলার চেপে ধরলো সুমন৷
" বাঁচানো গেলনা মানে? শূয়ার! এই তো কাল রাতে বললি একটু একটু ভেন্টিলেটর এ সাড়া দিচ্ছে "
কিরণ তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সুমনের গায়ে যেন তখন অসুরের জোর। ধ্বস্তাধস্তি তে ডাক্তারের এপ্রোন ছিঁড়ে গেল।
" তোকে দেখে নেবো,  তুই বাইরে বেরো "
সুমন কে টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে গেল কিরণ। তখনো বকে যাচ্ছে অনর্গল৷ কিরণ এক হাতে চোখের জল মুছছে আর এক হাতে সুমন কে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷
তারপর অনেক জল গড়িয়েছে। একমাস পর  পলাশকে যেখানে পোড়ানো হয়েছিল - সেই শ্মশানে বসে দুজন গাঁজা খাচ্ছে।
কিরণ বললো -
"সুমন, জানিস তো বিশ্বাস ই হচ্ছেনা মাল টা আমাদের সাথে আর নেই। মনে হচ্ছে এই তো সেদিন একসাথে..."
সুমন সেদিনের হাসপাতালের ঝামেলার পর চুপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু হঠাত্
কিরণকে থামিয়ে সুমন বলে উঠলো -
" আমরা কি ওকে ফিরিয়ে আনতে পারিনা? "

কিরণ - "তুই প্ল্যানচেট করবি বলছিস !? বিশ্বাস করিস ওসবে?? "

- না, আমি ফিজিক্সে বিশ্বাস করি। এই এক মাস আমি অনেক ভেবেছি। যদি আমরা টাইম ট্রাভেল করে অতীতে গিয়ে পলাশকে বলি তনুশ্রী র সাথে প্রেম না করতে তাহলে পলাশ বেঁচে থাকবে। You know that prevention is better than cure.

- দেখ্, আমি জানি তুই গাঁজা খেয়ে আছিস, তাই এসব বাজে বকছিস। হ্যাঁ গতিবেগ আলোর কাছাকাছি হলে টাইম স্লো চলে সেভাবে আমরা হয়তো ফিউচারে যেতে পারি, কিন্তু অতীতে!?

- কেন Einstein Rosen Bridge - ওয়ার্মহোল ?

- হ্যাঁ কিন্তু সেটা প্র‍্যাক্টিক্যালি সম্ভব নাকি!!??

- কেন নয়? নেসেসিটি ইজ দ্য মাদার অফ্ ইনভেনশন।

- গ্র‍্যান্ডফাদার প্যারাডক্স পড়েছিস তো? ধরে নেওয়া যাক কেউ অতীতে যেতে পারলো। গিয়ে তার দাদুকে মেরে দিল। তাহলে তো তার আর জন্মই হবেনা। তাহলে সে অতীতেও যেতে পারবেনা। আবার যদি অতীতে যেতে না পারে, তাহলে তার দাদুও মরবেনা। তাহলে আবার তার জন্ম হবে আর অতীতে যাবে, দাদুকে মারবে। এরকম ভাবে চলতেই থাকবে। অতীতে যাওয়া তাই সম্ভব নয়।

- না না নিশ্চয়ই অন্য কোনভাবে ভাবতে হবে, যদি আমরা কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে ভাবি স্ক্রোডিঞ্জার এর বিড়ালের মত কোন পার্টিকেল আছে বা নেই কিন্তু দুুটোই একসাথে নয় - এরকম সুপারপজিশান হলে এই প্যারাডক্স সমাধান হয়তো সম্ভব।

- ঠিক তো। চল্ খাতা পেন নিয়ে বসে পড়ি। গত সহস্র সাল মানবসভ্যতায় ড্রাগ দিয়ে মেডিসিন ম্যানেজমেন্ট এ রাজ করেছে কেমেস্ট্রি। ফিউচার অফ্ মেডিসিন হবে ফিজিক্স এন্ড ম্যাথেমেটিক্স।

এরপর দেখতে দেখতে কুড়ি বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম কোথা দিয়ে দুজন করে ফেলেছে তারা নিজেরাও জানেনা৷ তাদের গবেষণা এখন গোটা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে৷ সুমন-চন্দ-কিরণ মডেল গণিতের হিসেবে এখন পৃথিবীর ঘড়ি অনুযায়ী পাঁচ মিনিট এর জন্য একটা স্টেবল ওয়ার্মহোল বানাতে পারে যার মাধ্যমে তারা অতীতের এক প্যারালাল ইউনিভার্সে সেই সময়কালীন মানুষ হিসেবে পৌঁছে যাবে। পাঁচ মিনিট এর মধ্যে তাদের আবার ফিরে আসতে হবে এই ইউনিভার্সে। এই সময়ে না ফিরলে ওয়ার্মহোল ব্ল্যাকহোল এ রূপান্তরিত হতে পারে। ওয়ার্মহোল দিয়ে এই যাতায়াতের ফলে অতীতে যা পরিবর্তন আসবে সেটা তারা ফিরে এসে এই প্যারালাল ইউনিভার্সের টাইমলাইনে তার এফেক্ট দেখতে পাবে। পরিবর্তন শুধু নিজেদের মধ্যে নয়, গোটা ইউনিভার্সেও আসতে পারে। যেমন যে আমি অতীত এ গিয়েছে সেখানে থেকে ফিরে এসে দেখতে পারে সে অন্য কোন গ্যালাক্সির অন্য কোন গ্রহের বাসিন্দা। কিন্তু আশে পাশের মানুষগুলো একই আছে। পরিবর্তন এতটা বেশি নাও হতে পারে।
অপেক্ষা শুধু প্রথম পরীক্ষার৷ প্রথম গিনিপিগ হবে কিরণ আর সুমন নিজেরাই। কারো কোন বাধা তারা শুনবেনা। যেমন বলা তেমনি কাজ। সবকিছুই তাদের মডেল মেনে হল। শুধু তারা অতীতের ঠিক কোন সময়ে যাবে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলোনা। কলেজ লাইফে ফিরে যাওয়ার অংক কষে তারা কোন এক অজানা কারণে পৌঁছে গেল ক্লাস ইলেভেন এর শুরুতে। পলাশকে ফিরে পেয়ে তাদের কি আনন্দ।
"তুই বেঁচে আছিস! " বলে লাফিয়ে উঠলো। হাতে সময় কম। তাই পলাশকে সব কথা যতটা সংক্ষেপে বলা যায় বললো। পলাশ বুঝলো যে তার উড্ বি এক্স গার্ল্ফ্রেন্ড কে তাকে ইগ্নোর করতে হবে। আর তাদের তিনজনকে ভালো করে বায়োলজি পড়তে হবে যাতে ডাক্তারীতে চান্স পেয়ে তারা মেডিসিনের ফিউচারকে বদলে দিতে পারে ফিজিক্স আর ম্যাথমেটিকস এ।
দুজন যথারীতি ওয়ার্মহোল দিয়ে ঠিক সময়ে ফিরে এলো। কিন্তু ফিরে আসতে গিয়ে এবারো ঠিক সময়ে তারা ফিরতে পারলোনা।  হঠাত্ দেখলো তাদের সামনে পলাশ জোরে জোরে চুটকি বাজাচ্ছে।
"কিরে কিরে, তোরা তো দেখছি দুই ছিলিম টেনেই আউট!! "
বলে হা হা করে হাসতে লাগলো।
পলাশকে ফিরে পেয়ে সুমন আর কিরণ তাকে জড়িয়ে ধরলো। আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পলাশ বললো -
" নাহ্ মালটা সলিড ছিল বুঝতে পারছি। চরম নেশা। আসলে মানুষ কেন গাঁজা পছন্দ করেনা জানিস তো? গাঁজা খেলেই লোকে শান্ত হয়ে মহাবিশ্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এই যে একটা নিউরনের সাথে আরেকটা নিউরনের কানেকশন টা ঠিক নিতে পারেনা সবাই। শুধু কি ইন্টার নিউরন ইন্টার-ইউনিভার্স কানেকশন ও হতে পারে। "

পলাশ হাসছিল। কিন্তু পলাশের শেষ কথা শুনে কিরণ আর সুমনের টনক নড়ল। তারা যে কি অসম্ভব করে ফেলেছে শুধু তারাই জানে।
কিছুক্ষণের মধ্যে আবিষ্কার করলো  তারা অতীত থেকে বর্তমানে ফিরতে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছে আরেক প্যারালাল ইউনিভার্স এ যেখানে তারা এখন তিনজন একটা মেডিক্যাল কলেজের তিনজন পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েট ট্রেনি । পলাশকে আসল কথা কিছু না বলে,
পলাশ কে ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করলো সুমন -
আচ্ছা আমরা কেন মেডিক্যালে পড়তে এসেছিলাম মনে আছে তোর?
পলাশ আবার হাসতে হাসতে বললো - " মনে থাকবেনা আবার সেই ঐতিহাসিক গান্ডুগিরি !!  আমি একদিন স্বপ্ন দেখলাম, তোরা দুজন নাকি ফিউচার থেকে এসে বলছিস কোন এক মেয়ের সাথে যেন আমি রিলেশনে না যাই৷ আর কিসব মেডিসিন এর ফিউচার ফিজিক্স বানাবি না কিসব বুল শিট। স্বপ্ন টা পুরোপুরি মনেও ছিলনা৷ কিন্তু সেই স্বপ্ন তোদের এসে বলতে তোরাও বার খেয়ে গেলি। তারপর তিনজন গান্ডুর মত পড়ে জয়েন্ট পেয়ে তারপর এত এত পরীক্ষা দিয়ে এই খানে বসে গাঁজা খাচ্ছি৷  "
বলে পলাশ হা হা করে হাসতে লাগলো। কিরণ আর সুমন দুজনে একবার পলাশ আর একবার নিজেদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকল।
কিরণ হঠাতই চেঁচিয়ে উঠলো - তার মানে স্বপ্ন হল অন্য প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে অন্য ডাইমেনসনে তৈরি হওয়া একটা হলোগ্রাম।

 সুমন বললো - চল্ খাতা পেন নিয়ে বসা যাক্। এটা প্রমাণ করতে পারলে ফ্রয়েড আর আইন্স্টাইন দুজন এসে পরলোক থেকে প্রণাম করে যাবে।

কিরণ কোথা থেকে ছুটে গিয়ে রুমে কোন খাতা না পেয়ে একটা প্রেসক্রিপশন প্যাড জোগাড় করে আনলো। কিন্তু পেন নিয়ে বসে দুজনে ৫ মিনিট ধরে অনেক কিছু ভাবলো, গণিত এর মডেল টা যেন পেট এ আসছে, কিন্তু মুখে আসছেনা।
কিরণ সুমন কে বললো - কিন্তু অংক টা করতে পারছিনা কেন ?
পলাশ আবার হা হা করে হেসে উঠলো। বললো - "তোরা শেষ। পুরো শেষ। গাঁজা টা কিছু খাঁটি৷ এবার থেকে এর কাছ থেকেই কিনবো। আমার মনে পড়ছে ফার্স্ট ইয়ার এর কথা। ফিজিওলজি লেকচার ক্লাসে ঢুকে ক্লাস না শুনে আইনথোবেনস্ ল যে ভুল সেটা প্রমাণ করার জন্য কিরণ চেষ্টা করছিল। ম্যাডাম এর ক্লাস শুনছেনা বলে পুরো খিস্তি মের বের করে দিয়েছিলেন ৷ মনে আছে তোর সুমন !!?? তারপর সুমন গেছে সিনিয়র দাদা র কাছে আইনথোবেন বুঝতে। দাদা বলছে বোঝার কি আছে৷ যোগ শিখিস নি? গাঁতিয়ে নে,গাঁতিয়ে নে। সেদিন তোদের দুজনের মুখ যেরকম ছিল আজও ঠিক সেরকম লাগছে৷ ওরে, সাত-আট বছরের গাঁতের পর কি অংক আসে? ভারতের মেডিক্যাল সায়েন্স প্যারাসিটামল আর এন্টিবায়োটিক লেখা ডাক্তার চায়, উদ্ভাবনী চিন্তা চায়না।
গাঁজা খেয়ে কি ল্যামার্ক কেও ভুলে গেলি? "

সেদিনের সেই রাত কেটে গেছে। পরেরদিন সুমন আর কিরণ এসেছে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে রাউন্ড দিতে। পার্টি মিটিং হচ্ছে। একজন পার্টি প্রচুর ঘ্যানঘ্যান করছে। বোধহয় পেশেন্ট এর কোন বন্ধু হবে - " জানেন তনুশ্রী মেয়েটার নাম। বিষ টা খাওয়ার আগে একবার আমাকে বলতো!! "
রোগীটাকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করলো তারা।
যাইহোক, আল্টিমেটলি পেশেন্ট টা বাঁচলনা। ডেথ্ ডিক্লেয়ার করতেই একজন পার্টির হাতে সুমন গালে একটা থাপ্পড় খেলো। নিজেকে একটা অদ্ভুত ডাইমেন্সনে হারিয়ে ফেললো সুমন আর
শুনতে পেল কয়েকটা কথা - " বাঁচানো গেলনা মানে? শূয়ার! এই তো কাল রাতে বললি একটু একটু ভেন্টিলেটর এ সাড়া দিচ্ছে "।
থাপ্পড় টা যেন ডেজা ভূ তে থাকা ডাঃ সুমনের গালে নয় পাঁচ মিনিটের গোলকধাঁধায় ঘুরতে থাকা পেশেন্ট পার্টি সুমনের গালে পড়ল ।।

Thursday, August 23, 2018

বছর বিশেক পর

" Hello sir, this is 05.00 am of 22nd August of 2038, you are hereby informed that, I have thoroughly examined the patient , but couldn't find any peripheral or carotid pulse, heart beat , breath sound, corneal reflex, deep tendon reflexes . Pupil bilaterally fixed and dilated. Hence , I am sorry to declare that the patient is clinically dead "
একনাগাড়ে একটা যান্ত্রিক ভয়েস কথাগুলো বলে গেল মীরা কে। পার্টি কাউন্সেলিং রুমে বসে আছে সে। মীরা র বয়স আঠারো পেরোয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর তার একজনই দেখার মত সে হল তার স্বামী৷ যান্ত্রিক ভয়েস বলা শেষ করলে মীরা বললো - "কিন্তু ডাক্তারবাবু আমি তো কিসু বুজিনা। একটু যদি বলতেন আমার রুগী কেমন আছে।"
যান্ত্রিক ভয়েস বললো -" আপনার রুগী মারা গেছেন। "
"কি বলছেন কি " চেঁচিয়ে উঠলো মীরা। দৌড়ে চলে গেল নীচে। স্বামীর বাড়ির লোকদের কাছে জানালো, ডাক্তার বললো ও আর বেঁচে নেই।
বাড়ির লোকেরা সবাই চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বেঁচে নেই মানে! এই তো একটু আগে ভাইয়া দেখে এল, বললো কথা বলছে। মানুষটা কে মেরে দিল রে। চল্ আজ ডাক্তার কে পেটাবো৷ বলে সদলবলে সবাই চলে গেল পার্টি কাউন্সেলিং রুমে। এসি ফাঁকা একটা রুম। একটা সিসিটিভি ক্যামেরা আর স্পিকার লাগানো৷ সবাই চেঁচামেচি শুরু করে দিল। এই শালা হারামী ডাক্তার, বেরিয়ে আয়। মিনিট এক দুই চেঁচামেচির পর, কয়েকটা রোবট বেরিয়ে এলো।
একটা রোবোট বললো - আপনারা এখানে কেন ঝামেলা করছেন?
রোবোট দেরকে দেখে ঠান্ডা হয়ে গেল পার্টি। একজন বললো - আমরা বড়ো ডাক্তারের সাথে কথা বলতে চাই।
একজন রোবোট বললো - সরি স্যার। দিস ইজ নিউ টেকনলজি ইনস্টলড্। বড় ডাক্তারবাবু অনেক দূরে বসে আমাদের ইন্সট্রাকশন্ দেন। আমাদের প্রোগ্রামিং করেন।

একজন বললো - এই কুত্তার বাচ্চা।

রোবোট উত্তর দিল নির্লিপ্তভাবে - সরি স্যার, আপনার এই শব্দ আমার ডিকশনারি তে অন্তর্ভুক্ত নয়। কৃপা করে বাংলা ভাষায় কথা বলুন৷

একজন বললো - সরকার এত এত টাকা ঢালছে আর আমার রুগীকে চিকিৎসার গাফিলতি তে মেরে ফেলা হল কেন জবাব চাই।

রোবোট বললো - সরি স্যার, আমরা আই. সি. ইউ পরিচালনা করি লেটেস্ট গাইডলাইন আর প্রোটোকল মেনে। বাকি সব পেশার লোক ভুল করতে পারে, কারণ তারা মানুষ। আমরা রোবোট৷ স্পেশ্যাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন্সটলড্। মেড ইন সিলিকন ভ্যালি । আমাদের ভুল হয়না। আপনাদের রোজ সময়ে সময়ে রুগীর অবস্থা জানানোও হয়েছে তার রেকর্ডিং আছে আছে আমাদের কাছে। যদি আপনাদের মনে হয় গাফিলতি হয়েছে কোর্টে যেতে পারেন। প্রমাণ করতে না পারলে আমাদের কোম্পানি মানহানির মামলা করবে। আর এখন বাকি রুগীর স্বার্থে এই জায়গা ফাঁকা করুন। নাহলে উই আর সরি টু সে, আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবো। লাস্ট দুবছর গোটা পৃথিবীর হসপিটাল আমরা চালাচ্ছি। কোন মানুষ নয়। আমরা জানি কখন কি করতে হয়।

একজন ক্ষেপে গিয়ে বললো - কি করবি রে।??

রোবোট রা একে একে একে AK47 বের করলো। ১০ সেকেন্ডের মধ্যে সব ফাঁকা হয়ে গেল।

পরের দিন, শহরের বুকে একটা মিছিল বেরোলো। প্ল্যাকার্ডে লেখা - দাও ফিরে সে চিকিৎসক, লও হে রোবোট। 

জেলখানায় বসে মানুষ চিকিৎসকরা তাস খেলছিলেন। এ.আই. কর্পোরেট কোম্পানিগুলো হস্পিটালে রোবোট যে মানুষের থেকে বেশি এফেক্টিভ বলে সবাইকে নানা নেগলিজেন্স কেস এ এতদিন জেলে পাঠাতে লেগেছিল, আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে থেকে, সেটাতে আজ জেল গুলো চিকিৎসক এ ভরে উঠেছে । এমনিতে তাঁরা স্বেচ্ছা অবসর পেতেন না৷ শুরুতে ভয় পেলেও পরে জেলখানা র জীবনেই তাই তাঁরা আসল মুক্তির স্বাদটা পেলেন। যখন তাঁরা বলতেন কেউ শোনেনি তাঁদের কথা। চোর ডাকাত খুনি তকমা দিয়ে ঠেলে দিয়েছে সমাজ অন্ধকার সেলে৷
খবরে তারা মিছিল টা দেখলেন। তারপর মাথা চুলকে আবার তাস খেলতে বসে গেলেন। তাসের টুর্ণামেন্ট এ বেশি দেরি করা যায়না।

নিউজ চ্যানেলও চলতে লাগলো নিজের মত।
একজন বিশেষজ্ঞ জানালেন নিউজ চ্যানেল এ তাঁর মতামত -" যখন রোবোট এসেছিল চিকিৎসা ব্যবস্থায় তখন সবাই খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে আর গাফিলতি হবেনা। কিন্তু মানুষ এর জায়গা রোবোট রা নিলে পেশেন্ট পার্টি রাগ দেখাবে কাদের উপর! কাদের মেরে মেরে ঠান্ডা হবে!??  "

এক কানে ওই মতামত শুনে 'ফোর হার্ট ' কল দিলেন এক প্রবীণ চিকিৎসক ।।

Sunday, July 29, 2018

ত্রিভুজ

কুয়াশা এত সকালে কাটার কথা নয়। বুড়ির দোকানের স্পেশ্যাল চা এক চুমুক মিষ্টি শব্দে গ্রহণ করলো ভূমিকা । প্রেসিডেন্সী থেকে ফিজিক্স অনার্স পাস করেছে সে । কথায় চোখে মুখে সবসময় বুদ্ধিমত্তার ছাপ। চা খেতে খেতে সিগ্রেট খাচ্ছিল ভূমিকা। পাশের লোকগুলো হাঁ করে দেখছিল । ভূমিকার তাতে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। সে লিবারেল। তার হাতে সিগ্রেটটা যেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি একটা অঘোষিত তাচ্ছিল্যের জিহাদ। তার পরণে একটা টিশার্ট আর জিন্স। চুল বয়েজ কাট্। পেপার পড়ছিল। আমায় পেপার থেকে মুখটা তুলে জিজ্ঞেস করল, 'তা সুত্রধার বাবু আজ আপনি যাবেন কোথায় ?' আমি বললাম - 'আপনার সাথে সাথেই যাবো । নামবো একেবারে শেষে। যেখানে সবাই নেমে যাবে। '

- আচ্ছা আপনার আরেকটা নাম যেন কি ?

 - নেপথ্য।

- ও হ্যাঁ।

বলতে বলতে বাস চলে এল। আমরা দুজন উঠে পড়লাম। ফাঁকা বাস। ভূমিকার জন্য তবু সিট রেখেছিলেন তার সহযাত্রী বন্ধু - বান্ধবীরা। একসাথে গল্প করতে করতে যাবে বলে। আমিও গিয়ে ওইদিকেই বসলাম। বন্ধু-বান্ধবীর নামগুলো যেদিন প্রথম জেনেছিলাম খুব মজা লেগেছিল। কেন সেটা আর নাই বা বললাম। কিসব নাম। মাখন, প্রিয়া আর কোকিল। একদিন আমি বাসের শুরু থেকে উঠেছিলাম, যেখান থেকে মাখন আর প্রিয়া উঠেছিল। সেদিন বুঝেছিলাম মাখন প্রিয়াকে অন্য চোখে দেখে। কিন্তু প্রিয়া অলরেডি কমিটেড তাই মাখন প্রিয়ার জাস্ট গুড ফ্রেন্ড ঠিক যেমন সকালবেলার বাটার টোস্ট, উপরে একটু চিনি ছড়ানো। মাখন তার আর প্রিয়ার বাসযাত্রাটার একান্ত সময়টাকে যে কোকিল আর ভূমিকা এসে ঘেঁটে দেয় সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে বিরক্তি প্রকাশ করেই ফেলে। যাই হোক, আজ এসেই ভূমিকা বকতে শুরু করলো।



****
প্রথম ভুজ - 'লি-বালের'



'আজ পুরো ঝেড়ে দিয়েছি ওকে।' মাথা নেড়ে জানালো ভূমি।

প্রিয়া জানালো - দেখ তুই আবার শুরু করবিনা ওর কথা।

মাখন বললো - আ: বলতে চাইছে বলতে দে না। কোকিল সম্মতি জানালো - কি বলেছিস বল তো। ভূমিকা বললো - আর বলিস না আমি কাল একটা ডিপি দিলাম আমার কতদিনের একটা বন্ধুর সাথে একসাথে। আমরা অলি পাবে মদ খেতে গিয়েছিলাম। ও দেখে সেই পজেসিভ কমেন্ট শুরু করলো। আমি কিছু বললাম না। বিকজ ইউ নো সবাই উত্তর ডিজার্ভ করেনা। ডিপি চেঞ্জ করে দিলাম, ও তখন কি বলল জানিস এটা সুস্থ পোশাকের পরিচয় নয়। ও যে আমার সাথে একটা রিলেশানে আছে ভাবতে কেমন লাগছে। আমি আর থাকতে না পেরে ওকে বলে দিলাম অসুস্থ ছোটলোক। নিজেকে সাইকিয়াট্রিতে দেখাতে। বলে ব্লক করে দিয়েছি। আর নিতে পারছি না জাস্ট। একটা বাল।

প্রিয়া বললো - ভালো করেছিস বাবু। সারাজীবনের ব্যাপার। আর তুই যেরকম। আসলে সব ছেলেরাই এক।

ভূমিকা এবার রেগে বললো- 'আমি যেরকম মানে কি, তোদের মত বউ সেজে থাকতে পারবো না। ইফ ইউ কান্ট চেঞ্জ দা বয়, চেঞ্জ দা বয়। আমার সিম্পল ফান্ডা। সারমেয়, শারুখেয় এরকম কত ছেলেরা আমার সাথে ডেটে যেতে চায়। ভাবছি এবার অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া ভালো। '

সবাই হা হা করে হেসে উঠলো। এমন সময় প্রিয়ার বয়ফ্রেন্ডের ফোন এল। 'হ্যাঁ বাবু, না বাবু। তুমি বিশ্বাস করো।' একটু আড়ালে এরকম চলছিল । সেই সময় ওই বাসটায় একজন ভদ্রমহিলা উঠলেন নর্থ-ইস্টার্ণ।

তাঁকে দেখে ভূমিকা 'চিংকি' বলে উঠলো। সবাই হা হা হি হি করে নিল। প্রিয়া ফোন রাখতে মাখন বললো - 'দেখছিস আমাদের মধ্যে একজন বলছিল ছেলেরা এই,ছেলেরা ওই সে কিন্তু সবার আড়ালে ঠিক সহ্য করে নিচ্ছে।' প্রিয়া কিছু বললো না। ভূমিকা বললো - হ্যাঁ করবেনাই বা কেন, ওদের তো বাড়িতে সব ঠিক।

কোকিল এবার মুখ খুললো - হ্যাঁ তো ? তোরও তো বাড়িতে ঠিক ছিল। তুই লিবারেল বলেই তো বেরিয়ে আসতে পেরেছিস।

মাখন বললো - তোরা এত লিবারেল লিবারেল করিস। লিবারেল মানে কি জানিস ? কোন ভিন্ন মতকে সম্মান জানানো। এই যে তোরা একজনকে চিংকি চিংকি করছিলি আমি কিন্তু সাপোর্ট করিনা। তবুও আমি কিন্তু বন্ধুত্বের খাতিরে হেসেছি।


বলে একবার প্রিয়ার দিকে তাকালো সে শুনছে কিনা দেখে নিল। আবার বলতে শুরু করলো - আমি ভূমি যেগুলো করে সেগুলো মন থেকে সাপোর্ট করিনা। ও আবার তিনদিন পর কথা বলবে। এদিকে অন্যদের সাথেও ফ্লার্ট করবে।

ভূমি বললো - বেশ করেছি আমার ছাগল আমি কাটব না চরাবো আমার ব্যাপার।

 আমি এতক্ষণ ওদের কথা শুনছিলাম, এবার বললাম- বলছি ঝগড়া তো আপনাদের খুব জমে উঠেছে। আমি এতক্ষণ আপনাদের কথা শুনছিলাম। আপনাদের সাথে রোজ একসাথেই যাই। ভূমিকা আমায় চেনে। যখন আপনারা যেতেন না আমিই ওর সহযাত্রী ছিলাম। আমার মনে হয় ঝগড়া থামানোর একটা ভালো উপায় আছে। ভূমিকা বললো- কি?

আমি বললাম - আমার যা কাজ। একটা গল্প লিখেছি। গল্পটা আপনাদের মতই একজন ভদ্রমহিলাকে নিয়ে। রোজ বাসে আমাদের সাথেই যান। আমার সাথে আলাপ আছে নাম অন্তরা দেবী। গল্পটা লিখে ঠিক সুখ হচ্ছেনা। তাই আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি। আপনারা যদি কোন সুন্দর ফিনিশিং টাচ দিয়ে দেন বেশ হয়। আজকের যুগে আসলে গল্পে চমক না থাকলে মানুষের ইমোশনে ঠিক ঘা দেওয়া যায়না, তাই ভালো ফিডব্যাক পাইনা । আমার গল্পটা দার্শনিক হয়ে গেছে। রবিঠাকুরের যুগের অনুভূতির কচ কচানি এই যুগে কে পড়বে ? তাই মশলা চাই। মাংসের কষা টা যাতে আহামরি লাগে। যতবার পড়বে আলাদা মানে বেরোবে। মাখন বললে - 'বেশ, বেশ পড়ে শোনান। শুনতে শুনতে আমাদের গন্তব্য চলে আসবে। একঘেয়েমি কাটাতে আমাদের কিছু টুইস্ট সাজেস্ট করার থাকলে বলে দেবো। আপনার পাঠকরা পড়ে উদ্ধার করুক। '


আমি শুরু করলাম।



*****
দ্বিতীয় ভুজ-

'লাভের Love, Love-এর লাভ'


'সখী ভালোবাসা কারে কয়, সে কি কেবলি যাতনাময়, তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ভালোবাসা, ভালোবাসা '

হেডফোনে কানে পরিচিত গলায় গিটারের সাথে রেকর্ডিংটা শুনছিলেন অন্তরা দেবী। তাঁর ডাক নাম রেণুকা। ছোট করে সবাই রেণু বলে ডাকে। এমন একটা গলা যেটা শুনলে পাগলের মত ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। তাকে অনেকে অনেক ভাবে বুঝিয়েছে বেরোনোর উপায়, বা এটা ভালোবাসা নয় ইত্যাদি। এখান থেকে বেরোনোর উপায়, লোকজনের সাথে ভাঁটাও বন্ধু হিসেবে। কাউকে না কাউকে ভালো লেগে যাবে। সব বন্ধু, দাদা, দিদি কে বলেই দিয়েছে ওকে আর পাত্তা দেয়না। ওকেও বুঝিয়ে দিয়েছে, কিন্তু যে গানই শোনে মনে হয় ওর গলায় কি না ভালো লাগতো। ও তো ভেবেই নিয়েছে রেণু অন্য কারো সাথে রিলেশানে। ও ও হয়তো প্রেম করে নেবে । করুক। যা খুশি পাগলামি করুক। ওকে আর পাত্তা দেওয়া যাবেনা। অবহেলা করলে একদিন ও অন্য কারো সাথে চলে যাবে। রেণুও বসে থাকবেনা। অপশন খোলা রাখবে। আজ দেখলো ফেসবুকে একজনের স্ট্যাটাস 'অভ্যেসগুলো এখনো অবহেলার মানে ধরতে শেখেনি।' গানটা তাই হঠাত শুনতে শুনতে ভাবছিল, সত্যি ভালোবাসা মানে কি অভ্যেস ? রেণু কি সত্যিই ভালোবাসে ওকে ? ও বলে নানারকম দর্শন ভালোবাসার কিরকম ব্যাখ্যা দেয়। বাউলের নিষ্কাম প্রেমের সাধনা। রাধা-কৃষ্ণর প্রেমের ব্যাখ্যা। বিভিন্ন এদেশী, স্বদেশী কবিদের চোখে প্রেম। প্রকৃতি, প্রেমিকা, ঈশ্বর সব যেখানে মিলেমিশে একাকার। মাঝে মাঝে মন ভালো থাকলে শুনতে ভালো লাগে বেশ। কিন্তু এত ফিলোজফিতে তার মাথা গুলিয়ে যায়। ও কি সত্যি যা বলে অনুভব করে। অনুভব করলে মাঝে মাঝে এরকম ইনডিফারেন্ট হতে পারত ? অনেক পরীক্ষা করেও দেখেছে ও ওই ব্যবহারগুলো একা থাকার জন্যই করে, অন্য কোন মেয়েকে সময় দিতে নয়। রেণু কি করবে, ওর কথা ভাবলে ডুবে যায়, চেষ্টা করে তাই যতটা সম্ভব নিজেকে ডাইভার্টেড রাখার ওর থেকে। নানা ভাবে। ভুলে গেছে। আসলে প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে দুটো সত্তা থাকে। স্বপ্নবিলাসী আর বাস্তববাদী। ভালোবাসা এক, সম্পর্ক আর এক। সম্পর্কের মাধুর্য যখন কেটে যায় অভ্যসেটাই কোন সম্পর্ককে ধরে রাখে। তাতে ভালোবাসা থাকলো বা না থাকলো। আর ও বলে ভালোবাসা না থাকলে সম্পর্কের মরা অভ্যেসের কোন দাম নেই। ওর সাথে রেণুর আলাপ একটা মেন্টাল আসাইলামে। রেণু পেশায় একজন সাইক্রিয়াটিস্ট। ওর সেলের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছিল শুনছিল ওর গলায় -' তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা।' গান অনেকেই ভালো গায়। কিন্তু কিছু গলায় এমন ব্যথা থাকে ভেতরে স্বাদ লেগে থাকে। সেলের ভেতর অনুরণনটা ভেতরে অনুভব করছিল। বুকটা ধড়পড় করে উঠেছিল। কি অসাধারণ। তারপর ওর উপর একটা মায়া পড়ে যায়। এখন ওর আরোগেন্স অনেক কমে গেছে। ওর একটাই কথা -'মানুষ হল শিক্ষিত জানোয়ার। ' রেণু জানে ও মেন্টালি ডিসব্যালান্সড। কিন্তু এটাও জানে রেণু নিজে ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছে। এটাকেই হয়তো কাউন্টার-ট্রান্সফারেন্স বলে। আচ্ছা যদি ভালোবাসা অভ্যেসই হবে রেণুর ছয়জন বন্ধু সবাইকেই ওর ভালো লাগে আর অনেকদিনের বন্ধু। প্রায় নিয়মিত কন্টাক্ট। তাহলে এদের কাকে ভালোবাসে সে ? নাকি ওই পাগলটার প্রতি যে ভালোলাগার পাগলামি তৈরি হয়েছে সেটাই ভালোবাসা ? ওর খাতায় সেদিন রেণুকে নিয়ে কথায় কথায় ওর সামনে ও পেন নিয়ে লিখল । পড়ে দেখল - 'আমার মুক্ত সরলরেখা কবে এক জোড়ায় বৃত্তের সমীকরণ হল তোমার ছায়া ধরে। সেই পেয়ার অফ স্ট্রেট লাইন কখনো সসীম বৃত্ত, কখনো অসীমে বিলীন। আর একটু সময় ভালোবেসো, হয়তো যে স্বপ্নেরা গোলাপ ফোটায়, সে স্বপ্নেরা তোমার আমার ঠোঁটে বাসা বাঁধবে।'


শুধু অভ্যেসে এত অবলীলায় এই লেখা সম্ভব ? ও বলে - 'ভালোবাসা একটা কোয়ান্টাম পসিবিলিটি ওয়েভের মতো। একটা একটা ফেজে আসে। একটা একটা পকেটে। যেরকম সমুদ্রের তীরে একটার পর একটা ঢেউ আছড়ে পরে। ফেজে। একটা ঢেউ জানেনা পরের ঢেউএর টাইম টেবিল। কিন্তু বালুতট জানে সমুদ্রের পরের চুম্বনটা তার জন্যই রাখা। সমুদ্রও জানে বালুতট এর মনের কথা। এক্ষেত্রে অবশ্যই কথা টা হচ্ছে বঙ্গোপসাগর যদি আরব সাগরের তীরের মনের কথা জানে ভেবে ভাবে যে তাকে ভালোবাসে তবে হাস্যকর। যেমন একটা জাহাজের জন্য প্লাটফর্মে ওয়েট করা যায়না। এসব মহান অনুভূতি তাই যোগ্য পাত্রে দান করা উচিত। তুমি সেই আধার।'


ওকে মাঝে মাঝে বলে তোমার এসব লেখা আমি যদি লিক করে দিই নিজের নামে, বা অন্য কেউ মেয়ে পটানোর কাজে ব্যবহার করে ? তোমার চিন্তা হয়না? ও বলে-' হ্যাঁ , আমি অনেকের প্রেমপত্র লিখে দিয়েছি। কিন্তু চিন্তা হয়না। লেখাগুলো তো আমার নয়।'

রেণু মুখ বেঁকিয়ে বলে - ও আপনিও তাহলে অন্যের টুকে মেয়েদের মনে প্রভাব বিস্তার করেন।

ও বলে - কি জানি টুকে কিনা, তবে আমাকে নিয়ে কেউ যেন লেখায়। আর আমি তখন এই জগতে থাকিনা।


রেণু অবাক হয়ে তার কথা শোনে। সত্যি না অনুভব করলে এভাবে ভাবা যায়, বলা যায় ? ভুলে যায় এটা ২০১৬ সাল। নাকি সৃষ্টির শুরুতে সে আদমের সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর একমাত্র নারী হিসেবে একমাত্র পুরুষের কথা শুনছে। এই যুগে কে এত গভীরতা নিয়ে ভাবে ? মাঝে মাঝে তার এত স্বপ্ন, দর্শন পোষায়না। পাতি বাস্তব ধরে ভাবলে সে কোন কুল কিনারা পায়না। ওর সামনে এসে সময় থেমে যায়। সব দুশ্চিন্তা ভুলে যায়। মনে হয়, অনেক কিছু মনে হয়। মাঝে মাঝে সত্যি কথাগুলো মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। হ্যাঁ কিছুদিন প্রেম করার জন্য ঠিক আছে, কিন্তু সারা জীবন। না না। একটা পাগলের সাথে সারা জীবন কাটানো যায় না। সে তো অনেকের গলাই ভালো লাগে, তার মানে কি তাদের সাথে প্রেম করবে ? তার নতুন কয়েকটা বন্ধু হয়েছে। ও নতুন প্রেমে পড়লেই রেণু তাদের একজনকে ধরে বিয়ে করে নেবে। কাকে যে আসলে ভালোবাসে, সেটাই বুঝতে পারেনা রেণু। ওর মত স্বপ্নের দুনিয়াতে ভেসে গেলে মনে হয় ওকেই। কিন্তু বাস্তবে এলে এমসিকিউ চলতেই থাকে শেষ হয়না। শান্তি পাবে কি করে ? সোজা কথায় এত না ভেবে বেঁচে থাকতে গেলে কারো কন্সট্যান্ট কেয়ারে থাকতে হবে। তাই এত স্বপ্ন না ভেবে বাস্তব ভাবলে কারো সাথে রোজ শান্তিতে বেঁচে থাকাটাই ভালোবাসা। Love নয় লাভ চাই সবার। রেণুর বান্ধবী খুব পরিণত বাস্তববাদী।বলে-' বয়স হয়েছে এবার সেটলমেন্টে আসতে হবে। না ভেবেচিন্তে কাউকে আই লাভ ইউ বল। ডেট কর। কিস্ কর। দেখ এসব করার পর সে তোর আঁচলে বাঁধা থাকছে কিনা। না থাকলে ওকে স্ট্যান্ডবাই রেখে নতুন খোঁজ। একইভাবে। যেখানে লাভের গুড় মিলবে সব থেকে বেশি সেখানে বাসা বাঁধো। বাকি সবাইকে বন্ধু বানিয়ে নাও। '

রেণু বলে, 'ভালো না বেসে কিস্ করবো ? '

তার বান্ধবী বলে -' হ্যাঁ করবি। ছেলেরা এই যে বাতেলা করে প্রেমের, কেন করে মেয়েদের কাছে এসব পাওয়ার জন্যই তো। মেয়েরা কাছে কেন যায়, ছেলেদের পারমানেন্ট খুঁটি বানিয়ে রাখার জন্য। এটাই মোদ্দা কথা। যে খুঁটির শিকড় যত গভীরে সেই খুঁটি বেশি লাভবান। কাছে গেলেই ছেলেরা খুশি। আর যদি ছেড়ে দিতে হয় এভাবেই দেখাবি দোষটা ওরই ছিল। সোজা কথা যে শান্তিতে রোজ ঘুমাতে দেবে তার রোজ খোঁজ নেওয়াটাই ভালোবাসা।'


এভাবে লাভ দেখে Love হয় ? কিছুটা নরমাল জীবনে ফেরার পর ওকে অনেক ভাবে আবার খোলাখুলি প্রোপোজ করাতে চেষ্টা করে রেণু। কিন্তু পারেনা আর। এর থেকে ওরাই কেউ ভালো ছিল। সত্যি কথা বলতে মনে অশান্তি হলেও ও এমন কথা বলে শান্তি আসে। ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল - কাকে ভালোবাসেন আপনি ?

বলেছিল - 'পরে বলবো। '

তারপর দু'রাত পরে এসে বলেছিল, 'দু'রাত না ঘুমিয়ে ভেবে দেখলাম আমি কোন মানবীকে ভালোবাসার যোগ্য নয়।' রেণু জিজ্ঞেস করেছিল - 'তবে ?' ও রেণুর হাত ধরে হিড় হিড় করে ছাদে নিয়ে গিয়ে খোলা মাঠ দেখিয়ে বলেছিল - 'ওই যে বিরাট পৃথিবীটা চুপ করে পড়ে রয়েছে, ওই যে দূরের ঝিলে ঝুপ করে সন্ধ্যে নামছে, ওই যে সূর্যটা মা'র টিপের মত দিগন্তে মিশে যাচ্ছে ওদের সবাইকে ভালোবাসি।' তারপর একটা গাছকে দেখিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল - 'ভালোবাসি।' এ কি সত্যি এরকম। অনেকটা নরমাল হওয়ার পর ওকে সিডিউস করার বহু চেষ্টা করেও পারেনি। ও পাগল। এটা বুঝেছে। আগে প্রচন্ড আরোগ্যান্ট ছিল। এখন আর নেই। রেণু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল - 'আমি অন্যকাউকে বিয়ে করে নেব ভাবছি।' ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আবার রেণু বলল -' আপনি কি করবেন আমি বিয়ে করে নিলে ?' ও কোন উত্তর দিলনা। পাশ দিয়ে একটা বাচ্চা মার কোলে হাসছিল তাকে দেখিয়ে বললো হঠাত - 'দেখো দেখো। ' বলে নিজে খিল খিল করে হাসতে লাগলো। এতক্ষণ সূর্যের আলোটা একটা বট গাছের মগডালের ওপারে ঢাকা পড়ছিল। হঠাত সেই সূর্যের আলো ওই বটগাছের শেষ পাতাকে চুম্বন করে ওর মুখে এসে পড়ল। মুখ তুলে তাকিয়ে বললো- 'ছবি আঁকবো আপনার। নতুন গান লিখবো। কবিতা লিখবো। '

 'কি লাভ এসব করে ? কি পান ? ' চেঁচিয়ে জানতে চেয়েছিল রেণু।

 'মাঝে মাঝে পাই,সব সময় পাইনা। পেলে ভালো হত। ' বলে রবি ঠাকুরের মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাইনা গাইতে গাইতে চলে গেল। দূরে গিয়ে আপন মনে মাউথর্গান বাজাতে লাগল। ' এটা তো ব্রম্ভসংগীত !! এইসব আঁতলামি সময়ের সাথে সাথে হাস্যকর মনে হচ্ছে তার। টিনেজ চিন্তাভাবনা। কথাটা বলতে ও একদিন হেসে বলেছিল- 'হ্যাঁ এটা ঠিক। ভাবুন রবি ঠাকুর শেষ বয়সেও টিনেজ কবিতা লিখে গেছেন। ' ওর সাথে কথায় পারা যায়না। কখন আপনি বলে, কখনো তুমি। মাঝে মাঝে দুকানে দুহাত চাপা দিয়ে ও বলে- ' আমি আর ভাবতে পারছি না। পাগল হয়ে যাব।' পুরো পাগল। নেহাত পাগল তাই কিছু বলতে পারেনা। সে বছরের বসন্ত মাস। গাছের পাতারা বাতাস আর অভিকর্ষের মধ্যে মারামারি চালাচ্ছে। রেণুর চোখে স্বপ্নের মোহ কেটে গেছে। রেণুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। লাভ ম্যারেজ।





******
তৃতীয় ভুজ- 'ক্রসিং ওভার'



নিজের লেখা এতটা গল্প পড়ে একটা বড় শ্বাস নিলাম। সবাই চুপ করে ছিল। প্রিয়া হঠাত বলে উঠলো - এখানেই শেষ ? আর নেই ?

আমি বললাম - না। এরপর কি লেখা যায় বুঝতে পারছিনা।

মাখন বললো - সেই একই বিষয়, বড় একঘেয়ে। এত শোকের ছায়া গল্পে। সারকাজম হলে ভালো হত মাঝে মাঝে। ভূমিকা এতক্ষণ থমথমে মুখ নিয়ে বসেছিল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন একটা অন্য পৃথিবীতে ছিল।

হঠাত ভূমিকা বলে উঠলো - আপনার যেটা আসবে সেটাই তো লিখবেন। বিনোদন অনেকে করে। অভিনয় করেন সৌমিত্র। আপনি কোনটা হবেন আপনার ব্যাপার। আর তাছাড়া শোক ছাড়া তো শ্লোক হয়না। আমি উতসাহ পেলাম শুনে।

কোকিল বললো - ভূমি এসব কথা কার মুখে শুনছি ?

ভূমিকা বললো - কেন আমাকে কি ভাবিস?

মাখন বললো - তুই বাতেল না দিয়ে বরং শেষটা কিরকম হবে সাজেস্ট কর।

 আমি তাড়া দিলাম - হ্যাঁ ম্যাডাম বলুন বলুন। ভূমিকা শুরু করলে - অন্তরা দিয়ে জিনিসটা বেশ হল। সমাপ্তিটা আমিও দিতে পারবো না। ওটা আপনার কাজ। তবে একটা লেভেল ক্রসিং এর গল্প বলতে পারি। ওকে নিয়ে কিছু ফাঁক ফোকর বুজে দিতে পারি। ও পাগল। ওর মাথায় সব সময় কিছু না কিছু ঘুরছে। প্রচন্ড রকম মুডি। ও মানুষ খুব ভালোবাসতো। ওর পেশাটা ডাক্তারিই ধরা যাক। ওর পাশে শুলে একটাই প্রবলেম। ও যদি ডিউটি থেকে বাড়ি ফেরে মাঝরাতে কিরকম হয় জানেন তো। ধরুন আপনি ঘুমাচ্ছেন। হঠাত মাঝরাতে শুনলেন ও ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। বিড় বিড় করছে - 'হ্যাঁ হ্যাঁ নিয়ে চলে আসুন। না না কোন চিন্তা নেই। চাদরে মুড়ে নিয়ে চলে আসুন। ' আপনি ভাববেন কে এত রাতে ফোন করেছে রুগী দেখাতে। দেখবেন ও আসলে আপন মনে বকছে। একবার ও একটা গানের কাজ করছিল। ওর মাথাতেও ওটাই ঘুরছিল।গানের লিরিক্স, সুর। এতটাই যে শিয়ালদহ তে টিকিট কাটতে ভুলে গেল। ও টিকিট কাটবে না এটা হতে পারেনা। কিন্তু ওর খেয়ালই নেই। বিনা টিকিটে প্লাটফর্মে ঢুকছিল এমন সময় এক টিটি র সাথে ধাক্কা লাগলো। টিটি কে দেখে ওর টিকিট কাটার কথা মনে পড়ল। এতটাই অন্যমনস্ক ছিল টিটি র মুখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো -' এই রে আমার তো টিকিট কাটা হয়নি। যাই টিকিট কেটে আসি।' টিটি ওকে খপ করে ধরলো। ও এতটা বোকা নয়। কিন্তু যখন যে চিন্তায় ডুবে থাকে এরকমভাবে। ওকে তখন ঘাঁটালে ক্ষেপে যায়। ওটাই অন্তরা আর ওর শেষ দেখা ছিল। অন্তরার সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল ও। একটা প্লাটফর্মে অন্তরা আসত দেখা করতে। অন্তরার মুখে শুনল ওর বিয়ের কথা। তারপর প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে অন্তরা একদিকে চলে গেল। ও রেলগেটের অন্য দিকে। রেলগেট পড়ে গেল। ও বিদায়সূচক হাত নাড়ল। তারপর মাঝখানে ট্রেন পেরোচ্ছিল। অন্তরা উঁকি ঝুঁকি মারছিল ওকে দেখার জন্য। খুঁজে পাচ্ছিল না। কখন ট্রেনটা শেষ হবে। ট্রেনটা শেষ হল। লেভেল ক্রসিং এর এপারে দাঁড়িয়ে অন্তরা আর ওকে খুঁজে পেলনা।

এতটা বলে ভূমিকা থেমে গেলেন। সবাই চুপ। শুধু উল্লাসটা আমার মধ্যে ছিল।

প্রায় লাফিয়ে উঠলাম- পেয়েছি। দারুণ। আমায় এখুনি লিখতে হবে। আমি নামি।

মাখন বললো -' আরে চললেন কোথায় ? মাঝরাস্তায় ? '

আমি বললাম - আমার কাজ শেষ। সামনে আমার এক বন্ধুর অফিস। ওখানেই গল্পটা লিখে ফেলতে হবে। নাহলে ভুলে যাবো। চলি আবার দেখা হবে। ভূমিকা বললে - 'সূত্রধার বাবু, শুনুন একটা অনুরোধ। গল্পে মেয়েটির নাম অন্তরা না দিয়ে সমাপ্তি দেবেন। আর জানবেন ছেলেরা যেরকম গল্প, সাহিত্য, সিনেমার নায়কদের সাথে নিজেদের মিলিয়ে স্বপ্নে ভাসে কেউ সামনে, কেউ মনে। মেয়েরা কিন্তু নিজেদের স্বপ্নে ভাসে। একান্তই নিজেদের। সেই স্বপ্নগুলোই ওদের সব হয়। তাই এসব গল্প পড়ে দেখলে মেয়েদের বড্ড বেশি বাস্তববাদী চরিত্রহীনা লাগে। অন্তরা কিন্তু সেদিনেই সমাপ্তি হয়েছিল। ' বলে ভূমিকা ছল ছল চোখে বাইরে জানালা দিয়ে তাকালো। আমি নেমে পড়লাম। বাসটা চলে গেল আমাকে নামিয়ে। সামনের ফ্ল্যাটের রেলিং এ হাত দিয়ে থেকে দাঁড়িয়ে বাসটাকে দেখছিলেন সমাপ্তিদেবী। তাঁর মাথায় সিঁদুর। বাসটা যেন এতক্ষণ তার মনের তিনটে স্তরের রাস্তায় চলছিল ।।

ইনকা সভ্যতা, মমি ও বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮


সাল আনুমানিক ১৫০০। সন্তর্পণে সবার আড়ালে চোখের জল মুছলেন প্রৌঢ় ব্যক্তিটি। একটু আগেই তার বছর ৬ এর ছেলেকে আন্দীজ পর্বতমালার লুল্লাইল্লাকো আগ্নেয়গিরি র অনেক উপরে মাটি র ৫ ফুট গভীরে রেখে এসেছেন তিনি। লুল্লাইল্লাকো কথাটার আক্ষরিক অর্থ হল - মিথ্যে ছলনাময়ী জল। এরকম নাম হওয়ার কারণ - ওই আগ্নেয়গিরি  হল পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। উচ্চতা অনেক হওয়ার কারণে উপরে বরফ থেকে গলে জল হয় , কিন্তু নীচে নামতে না নামতেই পাহাড়ের গায়ে শোষিত হয়ে যায়। তো যাই হোক, বর্তমান ম্যাপ অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা আর চিলির বর্ডারে এই আগ্নেয়গিরি। যার খুব কাছেই আবার আটকামা মরূভূমি। আসলে আমরা আজ একটুক্ষণের জন্য চলে যাবো আমেরিকার ইনকা সভ্যতার সময়কালে। হ্যাঁ, ইনকা সভ্যতার বিস্তার বর্তমান পেরুর কুসকো কে কেন্দ্র করে হলেও তার বিস্তার আর্জেন্টিনা,  চিলি অবদিও ছিল । প্রৌঢ় ব্যক্তিটির ছেলে কিছুতেই ওখানে যেতে চাইছিল না। প্রচুর ছটপট করায় ওকে নিজের হাতে শক্ত করে বেঁধে ওই আগ্নেয়গিরি র যেখানে উষ্ণতা জিরো ডিগ্রী সেলসিয়াস এর অনেক নিচে সেখানে মাটির পাঁচ ফুট গভীরে আরো দুজন মেয়ের সাথে ওকে নামিয়ে আসা হয়। ওরা খুব ভালো জানে, ওই ঠান্ডায় আর আটকামা মরূভূমির শুকনো ওয়েদার ওদের এখনো অনেক বছর একইরকম ভাবে রেখে দেবে। শুধু থাকবেনা ওদের প্রাণবায়ু। মমি হয়ে থেকে যাবে। বাকি দুজন ও ওদের মত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মেয়ে। একজনের বয়স বছর পনেরো। আর একজন ওর ছেলের থেকে একটু ছোট। ওদের সবাইকেই কোকো গাছের নির্যাস খাওয়ানো হয়েছে যাতে ওরা ঘুমিয়ে পড়ে ওই বরফশীতল আবহাওয়া তে । শান্তিতে নিথর মোমের মূর্তির মত। ওদের প্রাণবায়ু বেরোলেই ইনকা সভ্যতার উপর যে দুর্ভিক্ষের অভিশাপ চলছে সেটা থেকে মুক্ত হবে এলাকা বাসীরা। এরকম বিশ্বাস তাদের। এই প্রথাকে "ক্যাপাকোচা" বলে।  কে জানতো তার ১০০ বছরের মধ্যে ইনকা সভ্যতা কে গ্রাস করে নেবে কলম্বাসের পথ ধরে আসা স্প্যানিশরা। ওদের ভাষা বাংলা নয়। রবীন্দ্রনাথ তখনো জন্ম নেন নি। কিন্তু মানুষের অনুভূতি তো পালটায় না।  কে জানত হয়তো ওই কাল্পনিক প্রৌঢ় পিতার মনে "দেবতার গ্রাস " কবিতার লাইনগুলোই এসেছিল। ওদের ওই বলিদান তখন কাজে এসেছিল কিনা আমরা নিশ্চিত নই। তবে কে জানত ৫০০ বছর পর ২০১৮ সালে সেটা কারো কাজে আসবে? কিভাবে?
তাহলে চলে আসুন , ২০১৮ বিশ্বকাপ পূর্ববর্তী ২০১৭ র কোয়ালিফায়ার ম্যাচগুলোতে চলে যাই। চলে আসা যাক টিম পেরুর অন্দরমহলে। নিজেদের টিমে গোল করার ভরসা একজন সে ব্রাজিলের ফ্ল্যামেংগো ক্লাবে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে। পেরুর ক্যাপ্টেন পাওলো গুরেরো। ১৭ টা কোয়ালিফাইং  ম্যাচ খেলে পেরুর বিশ্বকাপ খেলা তখনো নিশ্চিত হয়নি। এই অবস্থায় আর্জেন্টিনা র বিপক্ষে ম্যাচ খেলার পর ২০১৭ র ৩রা নভেম্বর পেরু টিমে খবর এল পেরুর ক্যাপ্টেন গুরেরো ডোপ কন্ট্রোল টেস্টে ফেল করেছেন। গুরেরো কে আপাতত ৩০ দিনের জন্য ব্যান করা হল। বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাব এ একসময় খেলে আসা এই সিনিয়র প্লেয়ার কে ছাড়াই পেরু নিউজিল্যান্ড কে হারালো আর বিশ্বকাপ খেলার ছাড়পত্র পেলো। কিন্তু বিশ্বকাপে যে ক্যাপ্টেনকে দরকার। এদিকে ৮ই ডিসেম্বর ২০১৭ তে প্রমাণিত হল গুরেরোর প্রস্রাবে পাওয়া গেছে কোকেন এর একটা মেটাবোলাইট - বেঞ্জোইলক্গ্নিন। তাই উনি এক বছর খেলতে পারবেন না। পেরু টিম ম্যানেজমেন্ট এর মাথায় হাত। খুব ভালো উকিল নিযুক্ত করা হল। কোনভাবে যদি প্রমাণ করা যেত যে পেরুতে যে কোকো পাতা থেকে তৈরি চা খাওয়া হয় সেখান থেকেও ওই বেঞ্জোইলক্গ্নিন তৈরি হয় তাহলেই এই নির্বাসন তোলা সম্ভব। গুরেরো র হয়ে তার উকিল সওয়াল করতে গিয়ে ফিরে যান ইনকা সভ্যতার ওই তিন মমির প্রসঙ্গ এ। ১৯৯৯ সালে আবিষ্কার হওয়া ওই মমি তিনজন এর শরীরে ওই মেটাবোলাইটটি পাওয়া যায়। এদিকে কোকেন কে কোকো পাতার অ‍্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট হিসেবে আইসোলেট করা হয় ১৮৬০ সাল নাগাদ। মমি গুলো তো তারও পুরানো। তার মানে ওদের শরীরে ওই মেটাবোলাইট এর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে, কোকো পাতার নির্যাস খেলেও ওই মেটাবোলাইট পাওয়া যেতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক রা এই মতবাদের বিরোধিতা করতে পারেন না। কারণ তারাই ১৯৯৯ সালে ওই মমিকে গবেষণা করে বলেছিলেন, যেহেতু কোকেন তখনো আবিষ্কার হয়নি, কোকো পাতার নির্যাস খাইয়ে তাদের এইখানে ঠান্ডায় জমে যেতে ফেলে যায় ইনকা সভ্যতার লোকজন রা। এই সওয়াল শুনে ব্যান উঠে যায় গুরেরো র উপর থেকে। বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব পেরোতে না পারলেও অস্ট্রেলিয়া কে হারানোর পেছনে গুরেরো র অবদান বিশাল। একটা ভালো গোল নিজে করেছেন, একটা গোলের পেছনে গুরেরো র ক্রস। ফ্রান্স ও ডেনমার্ক কে গ্রুপ লিগে সমানে সমানে টক্কর দিয়েছে পেরু।
আমরা কেউ জানিনা, গুরেরো সত্যি কোকেন নিয়েছিলেন কিনা।
তবে এটুকু জানি, চিলি, প‍্যারাগুয়েকে হঠিয়ে ২০১৮ বিশ্বকাপ খেলা পেরুর সম্মান রাখার পেছনে অবদান রয়ে গেলো সেদিনের ইনকা সভ্যতার তিন মমির।।

তথ্যসূত্র : Dr Angshuman Roy, Google news articles and Wikipedia

জিহাদ

" বন্ধুরা, সময় এসেছে আমাদের উপর যা অন্যায়, অবিচার হয়েছে তার জবাব দেওয়ার। আমাদের মধ্যে দুজন জিহাদি এখুনি রওনা দেবেন যকৃতের উদ্দেশে...."

সভায় চলছিল কিছু টিউমার সেলের মহান নেতার ভাষণ। আমরা এখন দুজন শ্রোতার কাছে যাব।।দুজনেই সচেতন স্যাম্পলিং এর শিকার।
একজন বললো
 - উফ্, এরকম গায়ের উপর চাপাচাপি করার স্বভাব গেলনা, না??
 - দোস্ত, এটা কি কথা, জন্মেছি ক্যান্সার সেল হয়ে, আমাদের এই বস্তিতে ভালোভাবে বেড়ে ওঠার তো নিয়ম নাই। উদ্বাস্তু হয়ে গায়ের উপর চাপাচাপি করেই তো বাঁচতে হবে।
 - চুপ কর্, আমাদের মহান নেতা আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন।
 - হ্যাঁ, জানি বলির পাঁঠা আমাদেরকেই বানাবে।কুফার সেলের নাম শুনেছিস?? আমাদেরকে গিলবে বলে বসে আছে।
 - এই চুপ, আমাদেরকে মহান নেতা উৎসেচকের টিকা পড়াতে আসছেন।

মহান নেতা এসে বললেন দুজনকে,
 "বন্ধুরা , এটা ধর্ম রক্ষার যুদ্ধ। এতদিন ওদের টি-সেল আমাদের মারতো। এবার আমরা এর জবাব দেব। পথে যেতে যেতে কোন টি-সেলের হাতে যদি আপনাদের মৃত্যু হয়, তাহলে মনে রাখবেন আমরা যখন গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাব, সেই সোনার দিনে আপনাদের এই বলিদান সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। আপনারা ওখানে দেখে সিগন্যাল পাঠালেই আমাদের অস্ত্র মিছিল যকৃত কলোনি তে পৌঁছে যাবে। জয় টিউমার"

- জয় টিউমার। জয় টিউমার।

 টিউমার সেল ভাইদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুই দোস্ত এগিয়ে গেল কোলাজেন সীমান্তের দিকে। একজন আরেকজন কে জিজ্ঞেস করলো।

 - দোস্ত এই জিহাদে কার লাভ??
 - মানে?
 - মানে জানিসনা??  ধর যদি পথে আমার মৃত্যু হয়, তখন আমার কাছে তো এই দুনিয়া শেষ।
 - হ্যাঁ, কিন্তু তার সুফল পাবে আমাদের পরের প্রজন্ম।
 - কিন্তু দোস্ত আমরা যদি চারিদিকে ছড়িয়ে যাই, তখন আমরা সেই মরা দেশের রাজা হয়ে কি করব ??

 দুজনের মধ্যে নীরব কুয়াশা নেমে এল।তাকে ভেদ করার ক্ষমতা দুজনের কারোরই ছিলনা। সামনেই দেখা যাচ্ছে রক্তবাহের লাল আভা।এপিথেলিয়াল লেয়ার পেরোলেই দুই বন্ধু ঢুকে পড়বে রক্তস্রোতে।।

পরমাণু-র গল্প

পাড়ার পান সিগারেটের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলো কিছু ইলেকট্রন। আমি একটি বিশেষ সংবাদপত্র পড়ে হাম্পটি-ডাম্পটি কণা খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।

ইলেকট্রনগুলো সারাদিন ডিপ্রেশনের কথা বলে, বেকারত্বের জ্বালা নিয়ে মেঘের মত ঘুরে বেড়ায় ক্লাবে ক্লাবে। হাইসেনবার্গের অনিশ্চয়তা আজও তাদের ভবিষ্যৎ ঘিরে বর্তমান। শুধু টিউশন থেকে পাড়ার যুবতী মেয়েগুলো যখন সন্ধ্যেবেলা ফেরে ওদের দেখে, টোন কাটে, চারিদিকে ঘুরঘুর করে। মেয়েরা পড়শি প্রো-টোনের দল, পজিটিভ এনার্জি দিয়ে যায় ওদের মনে। চারিদিকে ওদের দাদা, অভিভাবক নিউট্রন এর মত ঘিরে থাকায় আজ অবদি ইলেকট্রনদের প্রেমপত্র বিতরণ হল না। নাহলে কত প্রেমের চিঠি কত ভাবে লেখা হয়ে পড়ে আছে। ওদের দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে কিছু ইলেকট্রন, কিন্তু ওরা চলে গেলে আবার নেতিয়ে যায়। ওদের নাম ফোটন মস্তান ইলেকট্রন।

তো ওদের জিজ্ঞেস করলাম
- ভাই তোমরা হাম্পটি ডাম্পটি কে দেখেছো?

- দাদা আমরা তো "হাম্পটি শর্মা কি দুলহনিয়া" দেখেছি। তাও অনেক আগে। আপনি টরেন্টে পেয়ে যাবেন।

- আরে না সেটা নয়। এটা একটা অন্য জিনিস।

- কি জিনিস দাদা?

- যেটা ছাড়া সমাজ চলেনা, যেটা মানুষের উপর মানুষের উপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে।
একটা মোটা ভারী নাম "আদর্শ "। খুবই ক্ষণস্থায়ী আর ভারী। হাম্পটি ডাম্পটির মত।

( সবাই সমস্বরে হাসলো)

আমি আবার বিনীত ভাবে বললাম -
আরে রাস্তা ঘাটে খুঁজতে বেরিয়েছি পেপার পড়ে, তাকে নাকি খুঁজে পাওয়া গেছে। তারপর দেখলাম পূজার নাম করে বক্স বাজিয়ে মদ খেয়ে উত্তাল নাচ চলছে। বাম হাত আর বাঁকা পথ এ এত সক্রিয় মানুষ। তারপর দেখলাম সব কিছুই শর্ট আজকাল। সম্পর্ক। বন্ধুত্ব। ঘরে এক, ফোনে দশ ; এক রাতের মজা। শুধু প্রেমের সম্পর্ক নয়। খুব সেনসিটিভ সম্পর্ক যেগুলো যেমন শিক্ষক-ছাত্র, ডাক্তার-রুগী, বাবা-মা-ছেলে সব জায়গায় খুঁজলাম। মানুষের মূল্যবোধ, জীবনের দাম ছাড়া পেট্রোল - ডিজেল সহ সব কিছুরই দাম শুধু বাড়ছে। বন্ধু বন্ধুকে ঠকাচ্ছে। শর্ট যুগে কোথাও হাম্পটি ডাম্পটি কে পেলাম না।

একজন ইলেকট্রন আমার দু:খ বুঝে বললো-
আরে দাদা, হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকের যুগে মানুষের আটেনশন স্প্যান এত কমে গেছে
আজকাল সব কিছু শর্ট। আগে লোকে গোটা কবিতা পড়তো আর গোটা গান শুনতো। এখন একটা লাইন শোনে। আর কয়েক বছরে দেখবেন কয়েকটা শব্দ শুনবে। পরের শব্দের, পরের লাইনের প্রাসঙ্গিকতা কি ভেবেনা দেখলেও চলবে। লিরিসিস্ট দের ও সুবিধে, এক ছিলিম গাঁজা খাও যা মাথায় আসছে লিখে যাও।

- যেমন কিরকম?

- যেমন ধরুন, একটি মেয়ে তার ডিপি র নীচে আজকাল ক্যাপশন দেয় ধরুন "প্রতি চুম্বনে স্থির"। সে নিজে সেই গানটা পুরোটা শুনেছে কিনা সন্দেহ। তার শর্ট আটেনশন স্প্যান ওই তিনটি শব্দ শুধু ক্যাচ করেছে।

- কিন্তু মানুষ তো উপন্যাস পড়ছে।

- ছাই পড়ছে। কতজন আজকের যুগের লোক উপন্যাস পড়ে হাতে গুনে বলা যাবে। এখন মানুষের ছোট গল্প পড়ারও সময় নেই। অণু গল্প, পরমাণু গল্প এর যুগ বুঝলেন দাদা। এখন তো সরকার ডাক্তার হওয়ার ও শর্টকাট ব্যবস্থা করছে কয়েক মাসের ব্রিজ কোর্স করে।

- তাহলে কি হাম্পটি-ডাম্পটি কণাকে কোথাও খুঁজে পাবোনা ?? পেপারে যে লিখেছে সে নাকি সার্ণের সুড়ঙ্গ এ সুড়সুড়ি দিচ্ছিল।

- আরে ওরা এপ্রিল ফুল বানিয়েছে দাদা। সাংবাদিকেরও তো খবর দরকার। তাই ছেপে দিয়েছে। বাড়ি ফিরে যান। হাম্পটি ডাম্পটি কে শুধু বাচ্চাদের পড়ার বইতেই খুঁজে পাবেন ।।

পাঁচ মিনিট

"বিষ টা খাওয়ার আগে একবার আমাকে বলতো!! " কথাটা শেষ করতে না করতেই গলা ধরে এলো কিরণ এর। হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এর বাইরে ...