Monday, June 19, 2017

Buddha, the enlightened

সকাল হবে হবে করছে , প্লার্টফর্মে ট্রেন থামলো, একটি ছেলে উঠলো ট্রেনে ছুটে এসে। একদম ভোরের প্রথম ট্রেন, ফাঁকা ফাঁকা। একটা কোণে গিয়ে বসে পড়ল সিটে। তার পাশে আর সামনে পেছনে আরো পাঁচজন এসে বসলো। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে। হঠাত সাদা কাপড় পড়ে এক মুণ্ডিতমস্তক যুবক লাঠি হাতে উঠল ট্রেনে। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। ধীরপায়ে এসে সে ওই ছয়জনের পাশেই বসলো।
ট্রেন চলতে লাগল। সবাই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর মাঝে মাঝে চটিপায়ে ওই সাদা কাপড়ের লোকটির দিকে আড় চোখে দেখছে। শীর্ণকায় শরীর, অতি সাধারণ এক মুখ, চোখ দুটি কোটরস্থ, উজ্জ্বল এবং শান্ত । শারীরী ভাষা এতটাই অন্যরকম শান্ত যে বয়স কম হলেও সম্মান করতে মন জাগে।
কৌতুহল চাপতে না পেরে একজন প্রৌঢ় বলে ফেললো - কেউ মারা গিয়েছে নাকি ?
সাদা কাপড়ের লোকটি উত্তর দিল - হ্যাঁ, অনেকে। আমার সব ঋণাত্মকতা মারা গিয়েছে।
এরকম একটা অদ্ভুত উত্তর শুনে প্রশ্নকর্তা খুব কৌতুক অনুভব করলো।
উত্তর দিল - তা আপনি কি সাধু ?
উত্তর এল - আমি এমন একজন যে সর্বোচ্চ জ্ঞান লাভ করেছি । পরম সত্যকে জেনেছি। আর সেটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এসেছি। সংসারে মানুষের দু:খ কষ্টের উপশম করতে এসেছি। আমি একজন বুদ্ধ। সাধুও বললে আপত্তি নেই।
'তাই নাকি' এবার প্রথম সেই দাঁড়িওয়ালা যুবক ব্যংগ করে উঠলো।
'তা সাধু আপনি পারবেন আমার সমস্যার সমাধান করতে ? '
উত্তর এল, 'বলুন'
যুবক শুরু করলো।
' আমাকে সবাই কেমো বলেই জানে, হসপিটালে ডাক্তার ছিলাম ক্যান্সার বিভাগে। তারপর আমার একটি মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হয়। প্রচুর কথা হত। মেয়েটির সংগে আমার একটি ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়।তারপর জানতে পারি ও আমাকে প্রতারণা করেছে। আমাকে না জানিয়েই অন্য একটি ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ায়। রাগে অপমানে আমি ছটপট করতে থাকি। আমি সেই ছেলেটিকে একদিন আলাদা করে নিয়ে বসি। ছেলেটি আজেবাজে বলায় তাকে খুন করে দিই। আমার জেল হয়ে যায়। জেলে যাওয়ায় আমি চাকরি থেকে বরখাস্ত হই। জেলে ভালো ব্যবহারের জন্য আমি আজ ছাড়া পেয়েছি।কিন্তু রোজ রাতে ছটপট করতাম ছেলেটাকে খুন করেও আমার শান্তি হয়নি। শুনেছি ও আবার বিয়ে করেছে অন্য একজনকে। তাকেও খুন করবো যাচ্ছি। কিন্তু জানিনা শান্তি পাবো কিনা। এর সমাধান কোথায় বলুন। মেয়েটাকে খুন করলে কি শান্তি হবে নাকি নিজেকে ? '
বুদ্ধ স্মিত হেসে তাকালেন তার দিকে। কি অদ্ভুত শান্ত সেই হাসি। একটা সুনামিও স্থির হয়ে যেতে পারে সেই হাসি চোখের রেটিনায় চুম্বন করলে।
- তুমি ওকে ভালোবাসতে ?
- হ্যাঁ।
- কতটা ?
- অনেক। এখন ঘৃণা করি।
- আচ্ছা তুমি কোন ফুল পছন্দ কর ?
- গোলাপ।
- গোলাপ দেখলেই মনে হয় তুলে ওকে দিতে ?
- হ্যাঁ মনে হয়।
- আচ্ছা তুমি কখনো শরতের সকালে শিউলি গাছের তলায় গিয়ে প্রাণ খুলে শ্বাস নিয়েছ ?
- হ্যাঁ নিয়েছি।
- কেমন লেগেছে ?
- খুব ভালো।
- তোমার মনে হয়েছে গাছের সব শিউলি ফুলগুলো তুলে ওর হাতে দিতে ?
- না শিউলির ব্যাপার টা আলাদা। ওকে বরং গাছের তলা থেকে দাঁড়িয়ে আমার মত প্রাণ খুলে শ্বাস নিতে বলবো।
- শোন তুমি গোলাপ কে পছন্দ কর আর শিউলিকে ভালোবাসো।
- তার মানে কি বলতে চান ?
- ভেবে দেখো, যে তোমার কোনদিন ছিলনা, তোমার আড়ালে অন্যের সাথে সম্পর্ক করেছে সেই ফুলকে ভালোবেসে থাকলে তাকে যে গাছে মানায় সেখানেই থাকতে দিয়ে হাসিমুখে সরে এসো।
- কিন্তু এভাবে চলে যেতে দেওয়া যায় না যাকে ভালোবাসা যায়।
- হ্যাঁ যায় এটাই ভালোবাসা। ওকে ছেড়ে দাও। ফিরে না এলে ও তোমার ছিলোনা কোনদিন। শেষ দিনে কতটা তুমি ভালবেসেছো মানুষকে, কতটা নম্রভাবে জীবন কাটিয়েছ, কতটা ভালোভাবে কাউকে যেতে দিয়েছ যে তোমার জন্য নয়, এটাই শুধু মাথায় থাকবে।
অনেক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাত ধরা গলায় প্রথম যুবক বললো
- কিন্তু আম-মি যে মানুষ খুন করেছি, অনেক বাজে কাজ করেছি।
- যত কঠিন তোমার অতীত হোক, তুমি আবার নতুন শুরু করতে পারো।
- আমি কিভাবে শান্তি পেতে পাবো। ও আমাকে শান্তি দিত।
- ও নয়, শান্তি একমাত্র তুমিই নিজেকে দিতে পারো। বাইরের কেউ নয়।
- কিন্তু সাধু আমি অনেক খারাপ কাজ করেছি। ও আমায় ছেড়ে যাওয়ার সময়, আমি মেয়েদের প্রতি ঘৃণা থেকে অনেকের সাথে ফ্লার্ট করতাম। এর মধ্যে অনেকে নিশ্চয়ই ভালো ছিল। ওদের কে বন্ধু বলতাম। বেশি কিছু দাবী করলে ঝেড়ে দিতাম। আমাকে তো ওরা খুব ঘৃণা করে এখন।
- বেশ তো। সবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিও। এতে যদি শান্তি পাও। কেউ তোমার সাথে খারাপ কিছু করলে তাকেও ক্ষমা করে দিও। কখনো দেখোনি সকালের আলো কিভাবে জানালার ফাঁক চিরে প্রবেশ করে। ঠিক সেভাবে আঘাত পেলে সেই স্থান দিয়ে আলো প্রবেশ করে যদি তুমি চাও।
- আপনি কি করে ক্ষমা করেন যারা আপনার সাথে দুর্ব্যবহার করে ?
- হয়তো তারা ভুল করে, হয়তো তারা আমায় ভুল বুঝে করে। যাই করুক, আমি জানিনা তারা কি পরিস্থিতিতে করে। সবাই যে যার পরিস্থিতির স্বীকার। ক্ষমা করতে গেলে বুঝতে শিখতে হবে। বুঝতে গেলে ক্ষমা করতে জানতে হবে। তুমি জানোনা তার পরিস্থিতিতে তুমি কি করতে। তার মধ্যেও রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ সব আছে। রাগ মানুষের বুদ্ধিনাশ করে। সে সেটাই ভাবে যেটা সেই সময় তার পরিস্থিতি আর অভিজ্ঞতা ভাবতে বাধ্য করে। কাউকে ক্ষমা না করলে শান্তি পাবেনা। একমাত্র আলো পারে অন্ধকার কে দূর করতে। অন্ধকার পারেনা। তাই কাউকে সহজে বিচার কোরোনা। তুমি কেউ নও বিচার করার।
- রাগ কে বশ করার উপায় কি ?
- তার ক্ষতি করা খুব কঠিন যে কিছুই চায়না, শুধু ভালোবাসতে জানে। পৃথিবীর সব যুদ্ধ জয় করার থেকে নিজেকে জয় করা বড় জয়। মানুষের মন নিজেই নিজের সব থেকে বড় শত্রু আর সব থেকে বড় বন্ধু । তুমি কে পুরোটাই নির্ভর করছে তুমি কি ভাবছ তার উপর। নিজেকে জয় করতে পারলেই তুমি বুদ্ধ। প্রকৃত
জ্ঞানী। অনেক জন্মের অনেক ধাক্কা, যন্ত্রণা অভিজ্ঞতা আর সাধনা মানুষকে সেই জায়গায় নিয়ে যায়। আমি বলবো তুমি নিজেই সেই পথ খোঁজো । প্রকৃত জ্ঞানের পথ। হাজারটা বড় কথার থেকে একটু সাধনা সেই পথকে ত্বরাণ্বিত করে।
- সবাই যদি প্রকৃত জ্ঞানী হয়, তাহলে তো আর কেউ সংসার করবে না ।
- কেন সেটা হবে। বরং লোকে আরো শান্তিতে সংসার করবে।
- কেন ? আপনার পথ তো সন্ন্যাসের পথ।
- সংসারে জ্ঞানীর মত বেঁচে থাকাও তো একরকম সন্ন্যাস। হিমালয়ের কোলেও ফুল ফোটে।বাড়ির দালানেও। দুটোই সুন্দর। কখনো যদি কোন ফুল আর শিশুর দর্শন তুমি বুঝে থাকো তাহলে তোমার পৃথিবী অনেক শান্তিময় আর সুন্দর হয়ে উঠবে।
- কিন্তু যারা আমাকে ভুলে বুঝেছে তাদের আমি কি করে বোঝাবো, যে আমি পাল্টাতে চাই নিজেকে। যারা অপমান করেছে, আমাকে নিয়ে খেলেছে, মুখে একরকম বলে কাজের বেলায় যারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের ক্ষমা করে লাভ ?
- ক্ষমা করলে শান্তি পাবে। শান্তি পেলে পৃথিবীটা অনেক সুন্দর লাগবে। প্রাণ খুলে শ্বাস নেবে। হাসবে। যে যা করেছে, তাদের ক্ষমা করে দিও। এগিয়ে যাও সামনের দিকে। তারা কেউ আবার নিজের ভুল বুঝতে পেরে সত্যি ফিরে আসতে চাইছে এরকম মনে হলে ইচ্ছে হলে ফিরিয়ে নিও। নাহলে বুঝিয়ে দিও তুমি ফেরাতে চাওনা। সবাইকে ফেরানোও তোমার দায় নয়। এই পৃথিবীতে তোমার স্নেহ ভালোবাসা র সব থেকে বেশি দরকার তোমার নিজের। কাউকে আবার ফেরাতে গিয়ে নিশ্চিত থেকো সে আবার তোমায় অপমান করবেনা। কেউ না এলে একাই হেঁটে যেও। যে ঠিক বোঝার ঠিক সময় হলে বুঝে নেবে। সেটা তোমার দায় নয়। একটা কথা মাথায় রেখো, আমি বলছি বলে নয়, তোমার রাস্তা তোমাকেই হাঁটতে হবে। একাই।
ট্রেনটা থামলো। বুদ্ধর সম্মোহনী শক্তিতে সবাই তখন বশীভূত। বুদ্ধ ধীর গতিতে নেমে গেলেন। তার সাথে সেই ব্যংগ কর্তাও। বুদ্ধ প্লার্টফর্মে নেমে জানতে চাইলেন - কি ব্যাপার ? এখানে নামলে ?
লোকটি হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল একজন শীর্ণকায় সাধারণ চেহারার শ্বেত বস্ত্র ধারী যুবকের সামনে।
- আমি আপনার সাথে থাকতে চাই।
বুদ্ধ হেসে তার মাথায় হাত দিলেন। সকালের আলো তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

Thursday, June 1, 2017

বর্-অফ্

'ও তাহলে তুই বিয়ে করবিনা, কুমুদ ? '
অবাক হয়ে কুমুদুনীকে প্রশ্নটা করলেন তার কাকিমা ।
কাকিমা মধ্যবয়স্কা প্রাচীনপন্থী, হোমমেকার। স্বামীই তার ধ্যান-জ্ঞান। বিষয়আশয়, সংসার সামলানো, বিকেলবেলা থেকে সিরিয়াল এই তাঁর জীবন।
কুমুদিনী তাঁর মেয়ের বয়সী। সে
একগাল হেসে উত্তর দিল,
'কেন করবোনা? তবে তোমাদের মত নয়। '
কুমুদিনী নামটা তার বাবার দেওয়া। বাবা রবি ঠাকুরের বড় ভক্ত। তাই মেয়েকেও ওইরকম নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধুরা তাকে কু-মুড বলেই ডাকে। রবি ঠাকুরের চরিত্রগুলোকে ন্যাকামি রিগ্রেসিভ ছাড়া কিছু লাগেনা তার। কলেজে মাস্টার্স পাস করেছে তার উপর বিজ্ঞানবিভাগে। প্রোগ্রেসিভ লিবারেল চিন্তাভাবনা তার। ওই রবিঠাকুরের চিন্তা লেখাকে তার পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পাকামো ছাড়া কিছু মনে হয়না। তার বিয়ের বয়স হয়েছে বলে বাড়ির চিন্তার শেষ নেই।যেন তাকে বড় করেছিল টুক করে বরমালাটা নিয়ে কারো গলায় ঝুলে যেতে। কিন্তু তার হাবেভাবে সেসব নেই। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে সে এক সোচ্চার ভাষণ। তার আশেপাশে ছেলের অভাব নেই। যাদের বা কুমুদের একটু ভালো লাগতো তাদের চরিত্র দেখে তাদের পোষা বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে। যেসব বাড়ি থেকে তাকে দেখতে আসে তাদের ছেলেকে একটা ঘরের কোণে ডেকে নেয়। ছেলে ভাবে কতকিছু। কিন্তু কুমুদ আড়ালে ডেকে বলে - 'আমি একজনে সন্তুষ্ট নই।' কুমুদের আর তাই কোন সম্বন্ধ বিয়ে অব্দি গড়ায় না।
এহেন কুমুদের এরকম উত্তর শুনে কাকিমা বললেন - 'আমাদের মত নয় তো বুঝলাম, তো তোর ক্রাইট্রেরিয়া গুলো কি শুনি। '
কুমুদ উত্তর দিল - 'এমন কেউ যে বড়লোকের ছেলে। কম কথা বলবে, কম প্রশ্ন করবে, আমি রেগে ঝেড়ে দিলেও চুপ থাকবে। আমার জীবনের বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলোকে ঘাঁটাবেনা। রান্না করে দেবে। কাপড় কেচে দেবে। আমার গা হাত ব্যথা হলে হাত পা টিপে দেবে। আমি মদ খেলাম না সিগ্রেট খেলাম, কোন বন্ধুর সাথে সিনেমা দেখতে গেলাম, ঘুরতে গেলাম তার কোন কিছু বলার থাকবেনা। আমি যখন চাইবো চেষ্টা করবে সময় দেওয়ার। তার বাড়ির দায়িত্ব তার। তাকে আমার বাড়িতে এসে থাকতে হবে, আমার বাবা-মা কে দেখতে হবে। আমার মনে হলে মাঝে মাঝে তার বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আসবো। '
এতক্ষণ মুখ হাঁ করে শুনছিলেন কাকিমা। কিছু বলতে গিয়েও বেরলোনা, শুধু একটা কথাই ঢোক গিলে বললেন,
' এরকম কোন শিক্ষিত ছেলে পাবি ? '
'বেশি শিক্ষিত নিয়ে আমি করবোটা কি? চৌধুরী পরিবারে কোচিং সেন্টার খুলবো? '
এরকম কুমুদিনী যে বাড়ির বিয়ের চাপে সত্যি সত্যি একজন ওরকম ঘরজামাই হোমমেকার কে কোথাও থেকে ধরে নিয়ে আসবে কে জানতো। যেদিন প্রথম ছেলেটি চৌধুরীবাড়িতে ঢুকেছিল, দেখে মনে হয়েছিল কোন রাস্তার ভিক্ষুক। দুচোখের তলায় কালি, চুল উস্কো-খুস্কো, দুটো গাল ঢুকে গেছে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে লাঠি। মুখেচোখে এমন একটা বিষাদের ভাব যেন তার থেকে দুখী আর কেউ নেই।
কুমুদ বাড়িতে চালিয়েছে যে এর মা-বাবা মারা গেছে তাই ওরকম।
আর বন্ধুদের কাছে বলেছে, 'একটা গাধাকে পেয়েছি। ট্রেনে বাড়ি থেকে পালাচ্ছিলাম সেই সময়। মালটা বসেছিলো ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে ক্যাবলার মত তাকিয়ে ছিল। ওকে অনেকভাবে পরীক্ষা করলাম, খেতে টেতে পায়না বলে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। মাধ্যমিক পাশ। কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছে এখন হাতে কোন কাজ নেই। আমি ভাবলাম, ওকে আমার বাড়িতে আমার বর সাজিয়ে নিয়ে গেলে কেমন হয়। আমার ও আর বিয়ে বিয়ে করে কেউ চেঁচাবেনা। ওর ও থাকা খাওয়া হয়ে যাবে বলে অফারটা দিলাম। ছেলেটা একবাক্যে একবার ঘাড় নেড়ে জানালো সে রাজি। আর এটাও বললো আমি যবে বলবো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। '
কুমুদ ছেলেটির নতুন এক নাম দিয়েছে ঘুড়ি। মুখের ভাব সব সময়ই এক। এক অদ্ভুত বিষাদের ছায়া। বাড়ির সবাই তার কাজে খুব খুশি, তাই শুরুতে আপত্তি থাকলেও এখন সবাই তাকে নিয়ে খুশি। উড়িয়ে নেয় সুবিধেমত যে যখন পারে । রাতে বন্ধ দরজার এপারে কুমুদ খাটে ঘুমায়, ঘুড়ি নীচে মেঝেতে মাদুর পেতে ।
কুমুদের বাবা শুধু মেনে নিতে পারেন না। তাঁর বয়স হয়েছে। ডায়াবেটিসের রুগী। কুমুদকে তাঁর এখনো বাচ্চা মেয়ে লাগে, আজ আছেন কাল নেই। এরকম একজনের হাতে তাঁর মেয়েকে ছেড়ে যেতে মন চায়না।
একবার মেয়েকে এটা নিয়ে বলতে মেয়ে বলেছিল -
' দেখো বাবা, তোমাদের যুগে তোমরা মেয়েদের ঝি-বাঁদীর চোখে দেখেছ। এটা আমাদের যুগ। আমরা ছেলেদের চাকর করে রাখব।'
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। হঠাত একদিন কুমুদের কাকু মারা গেলেন। কাকু ছিলেন পন্ডিত মানুষ। এমন কোন বিষয় ছিলনা যেটা নিয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল না। কুমুদ বলতো চলমান উইকিপিডিয়া। তিনি মারা যাওয়াতে বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এল। এদিকে কাকুর ছেলের আর ছয় মাস পর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা, নানারকম এন্ট্রান্স এক্সাম। এতদিন তার বাবাই পড়াতেন। তিনি মারা যাওয়াতে সব দায়িত্ব এসে পড়ল কুমুদের ঘাড়ে। কুমুদ পড়েছে মহা বিপদে। সে পরীক্ষার আগে সাজেশন করে পাশ করেছে। একটা বিষয়ে মাস্টার্স। উ:মা: তে তার যদিও একদম ফুল মার্ক্স অংকে। উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান তাই তাও একটু পড়াশোনা করলে পারবে। কিন্তু কাকুর ছেলের কঠিন অংক গুলো সব মাথার উপর দিয়ে যায়। কোন মাথা মুন্ডু বুঝতে পারেনা কি করবে। কঠিন বিক্রিয়াগুলো কি করবে ধরতে পারেনা। অদ্ভুত অদ্ভুত সব পদার্থবিদ্যার অংক কি করবে বুঝতে পারেনা। সব সাজেশনের বাইরে। অগত্যা বন্ধুদের বলে। বন্ধুরা কে কত ব্রিলিয়ান্ট দেখাতে অংক কষে পাঠায়। সুন্দরী মেয়ের ব্রিলিয়ান্ট বন্ধুর অভাব হয়না। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়।
সে নাহলে এভাবে তাও কিছুটা ম্যানেজ করা গেল।কিন্তু বাংলা, ইংরেজি ? নোট মুখস্ত করে নাম্বার পেয়েছে সে। ভালো নাম্বার পাওয়াতে অনেকে হিংসে তে জ্বলে যখন তার জ্ঞানের সংগে নিজের জ্ঞান জাহির করতে এটা পড়েছিস, ওটা পড়েছিস বলতো তখন সে বলে দিত হ্যাঁ। সে পড়ুক, নাম শুনে থাক বা নাই পড়ুক। প্রেস্টিজ ইস্যু। কিন্তু এখন ? গ্রামার বই পড়বে সে ? নাকি ডিক্সনারি মুখস্থ করবে ? মুখে যখন ফটর ফটর ইংলিশে কথা বলে জানত না এত ভুল বলে। সাহিত্য ভালো জানে বলে দাবী করে এরকম বিজ্ঞানের বন্ধু আছে, কিন্তু কাকুর মতো অথেণ্টিক হবে এরকম কেউ নেই। এমতবস্থায়, তার কাকুর ছেলে যা পারতনা বা চেক করাতে হত, কুমুদ বলতো - তুই টেবিলে রেখে দিয়ে রাতে ঘুমিয়ে যাবি। আমি সময় মত সকালে নিয়ে তোকে যবে হোক চেক করে দিয়ে দেবো।
শুরুতে প্রচুর অংক আটকাতো তার কাকুর ছেলের। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তার কাকুর ছেলে সবই নিজে পেরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে এবারে যে পরীক্ষাতেই বসবে পেয়ে যাবে। কুমুদের খুব আনন্দ হল। ভাবলো গিয়ে একবার তার কাকুর ছেলেকে এনকারেজ করা দরকার। ভেবে তার পড়ার ঘরে গিয়ে বললো - 'কিরে ভাই তোর ব্রেন খুলে গেছে দেখছি। আসলে টিচার টা কে দেখতে হবে তো। '
ভাই বললো - 'হ্যাঁ সত্যি আমি তো অবাক হয়ে গেছি। তোকে বলতাম, তোর মাথায় গোবর ভরা। কিন্তু তোর ট্যালেন্ট দেখে মনে হল বাবার থেকেও তুই বেটার। সেদিন ওই অংক গুলো তুই তিন চার রকম ভাবে করে দিয়ে গেলি, আমি ওই ভাবেই ক্লাসে করেছি। জানিস আমায় স্যার কি বলেছেন ডেকে? ইউ আর এক্সেপসানালি ব্রিলিয়ান্ট। তবে উ:মা: এ যেন সিলেবাস মেনেই করি অংক। তবে দি সেদিন ওই জড়তা ভ্রামকের অংক টা আমি বুঝতে পারছিনা তুই কিভাবে করেছিস ?'
দিদি এতক্ষণ হাঁ করে শুনছিল। সে যে এত ব্রিলিয়ান্ট সে নিজেই জানতনা।তার বন্ধুরা এত কাজের ভেবেই ভালো লাগছে। সে বললো কই দেখি খাতা ?
ভাই খাতা এগিয়ে দিল। খাতায় করা চিন্হ গুলো দেখে তার মাথা গেল ঘুরে। এসব কি ? 'কে করেছে এগুলো ? ' বলে উঠলো কুমুদ।
সেদিন ঘরে একটা সভা বসলো। কুমুদ আত্মাতে বিশ্বাস করতো না। কিন্তু এই ঘটনার পর ? প্রায় হুবহু তার কাকার মত জঘন্য হাতের লেখায় হিজিবিজি করে একের পর অংক নানারকম ভাবে করা। কেউ যেন মোবাইল গেম খেলার মত আনন্দ নিয়ে করেছে অংক গুলো। প্রত্যেকটা সমাধানের পর লেখা 'গেম ওভার'। বাড়িতে যে কয়েকজন লোক, কুমুদ ছাড়া কারো ধারে কাছে শিক্ষা নেই যে ওইভাবে অংকগুলো নিয়ে খিল্লি ওড়াবে। শুধু তাই নয় বাংলা, ইংরেজি তেও যেরকম ভাবে কারেকশন করেছে। প্যারাগ্রাফ, বিশ্লেষণ অসাধারণ। সহজ সরল ভাষায়, যেখানে যে টার্ম একদম দরকার সেখানে সেটা। এটা কাকু ছাড়া কেউ পারতো না। মারা যাওয়ার পরও কাকু তার ছেলেকে দেখাচ্ছেন এভাবে।
বাড়িতে সবাই ঠিক করলো ব্যাপারটা কাউকে বলার দরকার নেই। গয়া তে কাকুর পিন্ডি দেওয়া হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। পরেরদিনই টিকিট কাটার কথা ছিল, যদি না আবার একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতো বাড়িতে। ভাই এর মৃত্যুর পর কুমুদের বাবা খুব ভোলা মনের হয়ে গেছিলেন। তার উপর সেদিন বিকেলে যখন জানতে পারলেন তার ভাই এর আত্মা এখনো শান্তি পায়নি, আরো আনমনা হয়ে গেলেন। তারপর দিন সকালেই হঠাত অজ্ঞান হয়ে গেলেন। কুমুদ তার বাবা শুয়ে আছে মাটিতে দেখে ঘুড়ি কে ডাকতে লাগলো চেঁচিয়ে। একটু দূরে ওখানকার ডাক্তার নৃসিংহ বাবু আছেন ঘুড়ি সাইকেলে করে গিয়ে, ডেকে নিয়ে আসবে। তার ভাইও ঘরে নেই। ওই বোধহয় সাইকেলটা নিয়ে গেছে। মাথা কাজ করছিল না। কুমুদ নিজেই ছুটে গেল ডাক্তার ডাকতে। কুড়ি মিনিট পর যখন ডাক্তার নিয়ে কুমুদ বাড়ি এল, দেখল, বাড়ির লোকেরা একটা ঘরের বাইরে উঁকি ঝুঁকি মারছে। সাইকেলটাও যথাস্থানে।মানে ভাই ফিরে এসেছে। কিন্তু সে ও তো বাইরে উঁকি ঝুঁকি মারছে। ব্যাপারটা কি ? বাবার কিছু হল না তো ? ছুটে গেল ডাক্তার কে নিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখল একি। ঘুড়ি !! তার বাবার এক হাতে স্যালাইন চলছে। আর ঘুড়ি তার বাবার পায়ের কাছে হাত দিয়ে ঘষছে। ডাক্তার চেঁচিয়ে বললেন, একি বাড়ির চাকরের হাতে একজন মানুষের স্বাস্থ্যকে ছেড়ে দিয়েছে।
কুমুদ তেড়ে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তাকে থামিয়ে দিয়ে ওর বাবা বলে উঠলো জড়তা ভরা স্বরে। 'ও চাকর নয় ' বলে চোখ মিললেন।
'বাবা তুমি ঠিক হয়ে গেছ? ' বলে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো কুমুদ।
এবার মুখ খুললো ঘুড়ি।
নৃসিংহ বাবুকে বললো - নমস্কার আমি ডা: স্বপ্নলোচন দত্ত। এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ। ইট ওয়াজ জাস্ট আ সিম্পল কেস অফ ডায়াবেটিক হাইপোগ্লাইসেমিয়া, দেখে বুঝতে পারি, কিন্তু ইমিডিয়েট ট্রিটমেন্ট দরকার ছিল। তাই কাউকে কিছু না বলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাই প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে। এখন ভয়ের কারণ নেই। কিন্তু খাওয়া দাওয়াটা ঠিক করে করতে হবে। আর আমি ফিরে দেখি ওনাকে জড়িয়ে ধরে সবাই কান্নাকাটি করছিল। ওটা ওনার হেলথের জন্য ভালো ছিলনা একেবারেই। তাই সবার সাথে বাজে ব্যবহার করতে হয়েছে, তাই দু:খিত।
যে দরজাটা বন্ধ ছিল, সেই দরজাটা ঠেলে আগেই খুলে দিয়েছিল কুমুদ। এতক্ষণ বাড়ির সবাই বাইরে ছিল তারা সবাই ভেতরে এসে হাঁ করে সব শুনছিল।
কুমুদের ভাই হঠাত বলে উঠলো- তুমি আমার জড়তা ভ্রামকের অংকটা বুঝিয়ে দিতে পারবে ?
স্বপ্নলোচন বললেন - নিশ্চয়ই ওগুলো আমারই করা।
কুমুদের বাবা বললেন - ও তুমিই তাহলে ভূত।
'ভূত না বরফের ছুরি।'
কথাটা বলেই কুমুদ গট গট করে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে কুমুদের ঘরে ঢুকলো স্বপ্নলোচন। দেখুন, ব্যাপারটা হল। আমি হায়ার এডুকেশনের জন্য একটা পরীক্ষায় বসেছিলাম, আমার অনেক বন্ধু পাশ করেছে। যে কারণেই হোক আমি পারিনি।এক বছর বেকার হয়ে বসেও পারলাম না। জীবনে কখনও চেষ্টা করে পারিনি এটা হয়নি। তার উপর মাথায় নিউরোফিজিক্স নিয়ে থিওরি বের করার ভূত ঘুরছিল। ফেল করে মাথাটা পুরো ঘেঁটে গেছিল। ভাবলাম তাহলে গান করি। কিন্তু কি লাভ। চাকরি নিতেও মন চাইলোনা। আমার বাড়ি আছে। কিন্তু এই পৃথিবীতে সব কিছুই ব্রম্ভ, মায়া মনে হল। সব দু:খের মূলে অসন্তুষ্টি। সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে ছিলাম। আমি কে? জীবন কি? আমার উদ্দেশ্য কি? খুঁজতে। আজ খুঁজে পেয়েছি। আপনার বাবা ঠিক হওয়ার পর আপানার মুখের হাসি দেখে। আমি ফিরে যাব। বাড়িতে কোন গ্রামের ডাক্তার হয়ে। ওখানে এরকম কত বাবা মা আছেন। যারা চিকিতসার অভাবে মারা যান। ওখান থেকেই বাকি জীবনটায় নিজেকে এক্সেলেন্ট করবো। আপনারা আমায় এতদিন থাকার জায়গা দিয়েছেন, আমি কৃতজ্ঞ। '
ফিরে তাকালো কুমুদ। তাদের ভেতরে এতদিন যে একটা সম্পর্ক ছিল হঠাত সে অনুভব করতে লাগল। সে বরফ টা গলে গিয়ে কখন যে কাউকে সে বর্-অণ করে নিয়েছে নিজেই বুঝতে পারেনি। মুখ ফুটে বলতে চাইলো অনেক কিছু। কিন্তু বেরলোনা। এতদিন এতকিছু করেছে ওর সাথে ক্ষমা চাইতেও কেমন লাগে। বলতে ইচ্ছে হল তুমি ফেল করনি। তার কাকু ছোটবেলায় তাকে বলতেন হিন্দুধর্মের মূল কথা - ঈশ্বর ই আসল কথা, তিনি যে পথে নিয়ে যান, যা কিছু দেন সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত, মা গৃধ কস্যচিত ধনম্ ।
কাকুকে সে জিজ্ঞেস করতো - এরকম কাউকে দেখেছো যে খুব জ্ঞানী কিন্তু সন্তুষ্ট ?
কাকু বলতো - না। তবে এরকম কাউকে পেলে তাকে কখনো যেতে দিস না। কারণ সে সত্যর পথ খুঁজে পেয়েছে।
আজ তাকেই, সেই স্বপ্নকেই চোখের সামনে নিজের চোখে দেখছে কুমুদিনী।যে মাটিতে শোয়, নিজের রান্না নিজে করে খায়, যে বস্তুবাদী চিন্তা থেকে দূরে।এই প্রথম তার ঘুড়ির মুখে এত কথা শুনলো আর হাসি দেখলো কুমুদ।
ঘুড়িটা একটু হেসে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল।হয়তো কোন খোলা আকাশের সন্ধানে।

Tuesday, May 16, 2017

উহ্য

কালকেই পরিচয় হল বছর উনিশের মেয়েটির সাথে। ওর শেষ মনে পড়ে বিশাল ঝড় উঠেছিল। সুনামি আলার্ট বেজেছিল। ওকে নিয়ে ওর বাবা-মা আরো অনেকের সাথে একটা সাবমেরিন জাহাজে উঠেছিল। তারপর প্রচুর ওলট-পালট। তারপর কিছু মনে নেই সেভাবে। চোখ খুললো যখন ও এই নির্জন দ্বীপে বালির উপর শুয়ে, শরীরে শক্তি ছিলনা। আবার জ্ঞান হারিয়েছিল। আমি এসে ওর জ্ঞান ফেরালাম। আমি যেহেতু একজন ভূতত্ত্ববিদ। পৃথিবীর বুকে মানবসভ্যতার উপর এই বিপর্যয় আসতে পারে আমি জানতাম অনেক আগে থেকে। কিন্তু এই দ্বীপের ভৌগলিক গঠন থেকে জানতাম হয়তো এর কিছু হবেনা। তাই এখানে এক বছর হল আমি আছি। অবশেষে সেই শেষ দিন এল। এই দ্বীপে আমার কাছে এই প্রথম কোন মানুষ এল। এর আগে সবাই জানোয়ার ছিল। অবশ্য মানুষ যে সব থেকে শিক্ষিত জানোয়ার। যাই হোক, আমি ওকে আমার কাছে রাখা কিছু ফল মূল খেতে দিয়ে সুস্থ করে তুললাম। ওকে আমার তৈরি একটা ছোট্ট ঘরে বিশ্রাম নিতে বললাম। ওর এখনো এই শক কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। পরেরদিন যখন ওর ঘুম ভাংলো, আমি আগুন জ্বালিয়ে বই পড়ছিলাম। এসে আমার কাছে ছটপট করতে লাগলো।
'আপনি দেখেছেন ? '
আমি জানতে চাইলাম - কি ?
- ওই যে ওই যে ওই ফুল টা। বেগুনি রংগের উপর হলুদ কাজ করা আর লাল লাল।
- হ্যাঁ, দ্বীপের মাঝের দিকে এরকম অনেক আছে।
- ইস্ যদি ওর সাথে সেলফি তুলে ইন্সটাগ্রামে দিতে পারতাম।
- সে তো বুঝলাম, কিন্তু দেখবে কে ?
- তা ও ঠিক।
বলে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে আবার ফিরে এল। বললো - আমার খুব মন খারাপ।
আমি জানতে চাইলাম - কেন ?
- কিছু না। ফেসবুকে লিখলে কত লোকে জানতে চাইতো।আমিও বলতাম।
- কি ?
- আমার বয়ফ্রেন্ডকে মিস করছি। এই এত রোমান্টিক জায়গায়।
- কিন্তু সে তো বেঁচেও নেই হয়তো।
- হ্যাঁ ওই জন্যই তো মন খারাপ।
বলে চলে গেল। আবার কিছুক্ষণ পরে এল। বললো
- আমার খিদে পাচ্ছে।
- যাও কিছু শিকার করে আনো।
- কিভাবে করে ?
আমি ওকে শেখালাম কিভাবে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে হয়। সামান্য একটু দূরে একটা জমা জলের জায়গা ছিল মেয়েটি গিয়ে সেখানে ছিপ ফেলে বসে রইল।
হঠাত বলে উঠলো - আমাকে বেশ ভালো লাগছে না ? আমার একটা ছবি তুলুন প্লিজ।
আমি একটা নির্বিকার ভংগিতে তাকালাম। মেয়েটি নিজেই বললো - তুলেও বা কি হত ? কেউ দেখার নেই।
কিছুক্ষণ পরে এসে বললো - আমার খুব মন খারাপ। আপনাকে শুনতে হবে আমার কথা।
আমি বললাম - না। শুনবোনা। আমি যেকোন দিন যে কোন কারণে মারা যেতে পারি। তুমি ও। একা থাকা অভ্যেস করো। যেখানে মানুষ একা সেখানে কোন দু:খের বিলাসিতা নেই।
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকালো। বললো - তাইতো।
এতটা লিখে পেনটা ফেলে রাখলো অবিনাশ। কিছুক্ষণ আগেই সে মেয়েটিকে মাটি খুঁড়ে সমাধি দিয়ে এসেছে। একটা বোনের মত স্নেহ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাত নিউমোনিয়া। এখানে আন্টিবায়োটিক ও নেই। পৃথিবীতো শেষ। তার এ লেখা পড়ার ও কেউ নেই। তবু লেখে সময় কাটাতে। যা মাথায় আসে।
চেষ্টা করে আবেগ কে বাঁচিয়ে রাখতে একা একাই, আবার যদি কেউ ভেসে আসে, অন্য কেউ অন্যভাবে।

হঠাত আবার পেন নিয়ে লিখল -
পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে,/
বহুকাল হল,/
সে কালের কাছে, /
তোমার আমার চেতনা,/
কত ক্ষুদ্র জোনাকির মত,/
তবু তুমি সেই -/
আণবিক দু:খের গান গাও।/
সব কালো ভুলে যাব একদিন,/
অপরিণত জেল এর মত থকথকে মনে,/
যে স্মৃতি বুকে আগুন জ্বালাতো,/
সব ভুলে যাব। /
একবুক আকাশের মাঝে, /
নীহারিকার ঘেরাটোপে, /
আবেগী ক্যানভাসে সাদামাটা - /
আছি সেই একি আমি, /
আলোকপথগামী। /
নব রূপে এসে তুমি, /
দামামা বাজাও।।

Wednesday, April 19, 2017

লুজার

'লুজার, লুজার, লুজার '
কানের মধ্যে এখনো বাজছিল জয়ন্তর। এসি চলছে। কিন্তু দরদর করে ঘামছিল সে। এইমাত্র একটা স্বপ্ন দেখে ধড়পড় করে ঘুম থেকে উঠে বুকে হাত দিয়ে দেখল, হ্রত্স্পন্দন টা মেট্রোনোমের বিটের মত খুব দ্রুত টেম্পোতে চলছে। স্বপ্নটা কি ছিল যেন? মনে করতে পারছেনা। ও হ্যাঁ, হাল্কা মনে পড়ছে। ওর প্রাক্তন প্রেমিকা তার হাজব্যান্ডের হাত ধরে ঘুরছে। ওর সাথে হঠাত্ দেখা, ইকো পার্কে। ওকে দেখে দুজনেই হাসতে লাগলো। তার প্রাক্তন প্রেমিকা ব্যংগ করে বললে,
'তারপর স্যার আর কত জায়গায় হারলেন। পকেটে টাকা আছে কিছু নাকি এই তুমি ওকে কিছু দাও টাকা, বহুদিন খেতে পায়নি দেখেই মনে হচ্ছে। '
বলে দুজন লুজার, লুজার বলছিল। ঘুম ভেংগে গেল। মিডি কিবোর্ডের সামনে বসলো। কিছু একটা ভেতরে জমছে। কি দু:খ, চাপা কান্না, নাকি, নাকি রাগ ?
রাগ, প্রচন্ড রাগ।
একদিন নার্সারিতে ওকে সৃজনশীলতায় সব থেকে কম নাম্বার পেতে হত।
একদিন ওকে স্কুলের ম্যাগাজিনে ওর লেখা নেওয়া হয়নি ক্রিয়েটিভিটির অভাবে। একদিন ওদেরকে নিজের কলেজের ব্যাকস্টেজে বসিয়ে রাখা হয়েছিল ঘন্টার পর ঘন্টা স্টেজ ওদের উপযুক্ত মনে করেনি । কোন এক ফেস্টের সোলো সিংগিং কম্পিটিশনে গিয়ে ওদেরকে পুরো গানটা শেষ করতে দেওয়া হয়নি, নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারণ বাকিদের মত গলা নকল করে হিট গান গেয়ে দর্শকদের কাছে হিট হতে চায়নি। নিজেদের গান গাইছিল। স্টুডিও থেকে কথা না শুনেই বের করে দিয়েছিল ওদেরকে। রাগ, প্রচুর রাগ। আসছে না কোন মেলোডি লাইন। আসছেনা। লুজার , লুজার। কানে বাজতে লাগলো। একটা কিছু লেখার চেষ্টা করলো। বেরোলো দুটো লাইন,
'সামনে যে খিলখিল হাসি, /
আড়ালে সে ঠকে যাওয়া কান্না বাসি। '
না আসছেনা। আরো ভালো চাই। কানে বাজতে লাগলো লুজার, লুজার। টিভি অন করলো বহুদিন পর। একটা ফুটবল ম্যাচ চলছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের । দেখতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে সে আবিষ্কার করলো তার চোখ টিভির স্ক্রিনে থাকলেও, সে আদৌ ম্যাচটা ফেখছেনা। কিছু একটা বেরোতে চাইছে ফেটে। দু:খ, চাপা কান্না, নাকি রাগ। রাগ, প্রচন্ড রাগ। টিভিটা বন্ধ করে। দুকান চাপা দিয়ে সে অনুভব করলো তার চারিদিকে যেন গুলি ছুটছে। প্রচুর শব্দ। আর পারছেনা নিতে। সামনে একটা ব্লেড দেখলো হাতে নিতেই তার শ্বাস আরো গভীর আর দীর্ঘ হল। না আর নয়। সত্যি সে লুজার। দয়া চাইনা। ব্লেডটা নিয়ে ডান হাতে ধরে বাম হাতের কব্জির কাছে থর থর করে কাঁপতে লাগলো। হাল্কা চাপ দিলো। হচ্ছেনা। লাগছে। ছুঁড়ে ফেলে দিল ব্লেডটা । চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। ফ্ল্যাটে কেউ নেই। একা। কিন্তু সে
চিত্কার টাও আসছেনা। ভোকাল কর্ডকে কেউ লোকাল দিয়ে প্যারালিসস্ করে দিয়েছে। ঘাড়টা নাড়তে নাড়তে গিটার টা নিল হাতে ।
সকাল হয়েছে কিছুক্ষণ। সূর্য উঠেছে নতুন আশায়, নতুন বিশ্বাসে। নতুন গান লিখে ফোন করলো সে তার সংগীকে।
সংগী খবর দিলো,
' তিনটে পার্ফমেন্স আছে এই সপ্তাহে। দৌড়াতে হবে এবার। আমাদের ওরা ডাকছে এখন। সময় বেঁধে দিয়েছি। এক ঘন্টা স্টেজে থাকবো। তার মধ্যে পনেরো মিনিট বাতেল থাকবে। এক ঘন্টার একটা সেকেন্ড ও বেশি নয়। দৌড়াতে প্রস্তুত লুজার ? '

Thursday, March 9, 2017

প্রথম সন্ধ্যে

নিমগাছের উপর বসে ফেসবুক করছিল একটা ভূত। নাম ক্ষিতি। তার বহদিনের শখ ছিল সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পাওয়ার। অনেক ঠকে শেষে একজনকে বিয়ে করলো। কিন্তু তাকেও যেদিন দেখলো সে অন্যদের সাথে ফ্লার্ট করছে বাধ্য হয়ে ঠিক করলো সুইসাইড করবে। কিভাবে মরলে সব থেকে কম ব্যথা পাবে এই ভাবছিল। পাহাড়ের খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। ভাবত কেউ যদি পিছু ডাকে সে ফিরে আসবে ভালোবাসার লোভে। ট্রেনলাইনে দাঁড়িয়ে থাকতো যদি কোন নারী তাকে টেনে সরিয়ে দেয়। তার কাছে ভালোবাসার ভিক্ষা চাইবে। এরকম একদিন ময়দানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ভিক্টোরিয়া কে দেখছিল সে, উপর থেকে বাজ পড়ল মাথায়। তারপর থেকে তার ঠাঁই হল এই নিমগাছে। ফেসবুক সার্চে গিয়ে সার্চ করলো তার বউ এর প্রোফাইল। দেখলো নতুন বিয়ে করেছে। হাজব্রান্ডের সাথে ডিপি। ক্ষিতি এখন ব্যানড্। মোবাইলটায় চালালো শ্যামাসংগীত।' ভেবে দেখ মন কেউ কারো নয়।' ডিপি পরিবর্তন করে শাহুরুখের 'কাল হো না হো' র ছবি লাগালো। কাল হো না হো র ভিডিও টার সাথে নিজের মিল পেল। পা দিয়ে নাচাচ্ছিল নিমগাছের ডালটা। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়া তাকে জানিয়ে দিচ্ছিল যে সেও তার মতই বিষণ্ণ। এমন সময় হঠাত একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এল। কুহকিনী সান্যাল। দারুণ দেখতে। আক্সেপ্ট করতেই ক্ষিতির ডিপি লাইক করলো কুহকিনী। ক্ষিতি মেসেজ পাঠালো।
'হাই আমি ক্ষিতি। নাম তো শুনেই থাকবে। '
সেই শুরু। একমাস কেটে গেছে। তারা এখন অনলাইন রিলেশনসিপে। কিন্তু কিছুতেই দেখা হচ্ছে না। যেদিন ক্ষিতি বলে দেখা করবে, সেদিন মেয়েটি বলে তার কাজ। যেদিন মেয়েটির হয়, ক্ষিতির হয়না। হয়না মানে ক্ষিতির কাজ তো কিছু নেই। নিজের মুন্ডু খুলে চোখের কোটরে আংগুল ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দেওয়া ছাড়া। তবু শেষ মূহুর্তে এসে ভাবে ও তো একজন মানুষ, পঞ্চভূতে গড়া একজন রক্ত মাংসের। আমি তো ভূত।ছদ্মবেশ ধরেও কতদিন আর চলবে। কিন্তু আজ ক্ষিতি ঠিক
করে নিয়েছে। এভাবে তো চলতে পারেনা। অনলাইন। এবার দেখা করতেই হবে। ও যদি সত্যি জেনে ক্ষিতির সাথে থাকে তো ভালো। নাহলে নেই। নেই তো নেই।
মেয়েটিকে বললো - আমি আজ বেরোচ্ছি। নন্দনে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় অপেক্ষা করবো। তুমি যদি না আসো আমাদের ব্রেক আপ।
খুব খুশি ক্ষিতি। আসার সময়েই দেখে নিয়েছে মেয়েটি মেসেজ পাঠিয়েছে - আসছি।
সন্ধ্যেটা নেমেছে রাস্তায় লোকজন কমছে। হালকা কুয়াশায় আত্মগোপন করা খুব সোজা। তারপর সে এল। এসেই ক্ষিতি কে বলল - চিনতে পারছ? এবার শান্তি ?
ক্ষিতি একগাল হেসে বললো - চলো ময়দানের দিকে যাওয়া যাক।
- সে কি এই সন্ধ্যেতে ওদিকটা তো নির্জন।
- হ্যাঁ তাহলেই তো সুবিধে আমার।
বলেই ক্ষিতি জিভ কাটলো। ও বলেছে অন্য মানেতে। মেয়েটি ভেবেছে অন্য মানে তে। দেখলো মেয়েটির গাল লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। যাক একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। জড়তা তো কাটলো এতে।
পাশাপাশি হাঁটছিল দুজন। এলিয়ট পার্কের পাশের ফুটপাথে এসে ক্ষিতি পেছন থেকে মেয়েটিকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তারপরে পেছন দিকে হঠাত চোখ পড়তেই একহাত দূরে ছিটকে গেল ক্ষিতি - "একি।
তো - তোমার ছায়া পড়ছে না কেন? তা - তার মানে তুমি? তুমিও.... "
মেয়েটি নির্লিপ্ত হয়ে তার কাছে এগিয়ে এসে গলায় দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো - 'জানো তো একটা কথা আছে, ট্রু লাভ ইজ লাইক ঘোস্ট। এভরিবডি টক্স্ আবাউট, বাট নোবডি হ্যাজ সিন।'
কুয়াশাটা আরো ঘন হল।

Wednesday, March 1, 2017

আমাদের ব্যান্ডের গল্প

কি নাম দেওয়া যায় ? একজন বন্ধু মজা করে বললো, 'বিছুটি' দাও। ক্যাকটাস যদি ব্যান্ডের নাম হতে পারে। বিছুটিও হতে পারে।
কবিতা লিখতাম দুজনেই , কিন্তু গান লিখবো কখনো ভাবিনি। ভেতরে রবিবাসরীয় কবিতা গুলো জমছিলো চেপে চেপে। সেগুলো সুরের ভেলা চেপে গান হয়ে গেল। তারপর থেকে বাথরুম, গড়ের মাঠ থেকে ফেয়ারওয়েল ফাংশান হঠাত ফোন আসতো,
' দাদা, এসো। মাথায় একটা সুর এসেছে। '
জয়ন্ত না থাকলে আমি রুমের বাইরে কখনো গাইতাম না।
তারপর অনেকদিনের গ্যাপ।  আজকেই আমি এটা লিখছিলাম পোস্ট করবো বলে, দেখলাম জয়ন্ত তার আগে পোস্ট করেছে।
 হয়তো খুব শিগ্রি ফিরছি। আমরা একসাথে। আমাদের ডায়েরিতে এখনো অনেক অপ্রকাশিত গান, মাথায় অনেক জমে থাকা কবিতা, আর আমাদের চারিদিকে অসংখ্য সুর।
এনট্রপি বাড়ছে, গোলা- গুলি - সন্ত্রাস-ঘৃণা। একটাই জিনিস এগুলো জয় করতে পারে। গান।
আমরা তাই গানে বেশি ক্যাওস রাখিনা। আমি একটু হলেও রকের পক্ষপাতী। জয়ন্ত সেটাও নয়। এরকমও হয়েছে আমি একটা জায়গায় একরকম সুর চাইছি, জয়ন্ত একরকম। সেই ঝগড়াগুলো মিস করছি। প্রত্যেকটা গানের সংগে প্রচুর স্মৃতি জড়িয়ে।

ছোট্টবেলার স্বপ্ন হাজার,
হারিয়ে যাওয়া কত কবিতা,
আকাশ থেকে নেমে আসা,
কত সোনালী রোদ্দুর,
তাই ফিরে এলাম তোর কাছে,
তোকে আমার বলার আছে।

ফিরতে তো হবেই।

Saturday, January 7, 2017

আলো

'এখন ভারতে ১০০ জন পুরুষ পিছু ৯৪ জন মহিলা এর জন্য মেয়েদের খুব সুবিধে হয়ে গেছে, আর ছেলেদের অসুবিধে। ' বলতে সবাই হা হা করে হেসে উঠলো।
আর একজন মেয়ে বলে উঠলো 'যে কারণে এখন গ্যাংগ ব্যাংগ টা বিশেষ সাইটে খুব চলছে। ' আবার হাসির সুনামি এল।
পার্টি শেষের মুখে । পার্টির বুদ্ধিটা শ্যামলবাবুরই ছিল। বেশকিছুদিন হল তার ছেলের লক্ষণ গুলো খুব সুবিধের মনে হচ্ছিলনা। শ্যামলবাবু পেশায় একজন চিকিতসক। তার ছেলে ও ডাক্তার। তার মা আলাদা থাকেন তার বাপেরবাড়িতে। আগেরদিন যখন তার ছেলে প্রহ্লাদ এসে বললো - 'বাবা আমি প্রচন্ড রকম বিচলিত এই সংসারের অনিত্য নিয়ে। আমি সত্য কি জানতে চাই। তাই আমি ঠিক করেছি সংসারের মায়াজালে নিজেকে আর আবদ্ধ করবোনা। '
বাবা বিষয়বিমুখ ছেলেকে বলেছিল, ' দেখ্, তুই এখন যুবক। এই পৃথিবীর কিছুই ভোগ করিসনি। তুই এখন প্রতিষ্ঠিত। সরকারি অফিসার। অনেক সম্মান তোর। তোর সংসার করার বয়স হয়েছে। তোর বয়সে এ ধরনের কথা মানায় না।'
ছেলে - 'যদি আমায় বল আমার মৃত্যু হবেনা, রোগ হবেনা, বার্ধক্য আমাকে গ্রাস করবেনা, আমার লাইফ পার্টনার আমাকে ছেড়ে যাবেনা, তার মৃত্যু হবেনা, বিপদ আমার বিষয় সম্মান নাশ করবেনা তবে আমি তোমার কথা মানবো।'
বাবা-
'বেশি পড়াশোনা করে তোর বুদ্ধিভ্রম হয়েছে। এই বুদ্ধি মাথা থেকে মুছে ফেল্। যে ইরেলিভ্যান্ট আর অপ্রাপ্য কামনা করে সে উপহাসের পাত্র হয়ে থাকে।'
ছেলে -
'তা হই। কিন্তু এটা তো আরো হাস্যকর যে মানুষ অজ্ঞ আর অহংকারে মত্ত। তাই নিজে পরাধীন, রোগ আর জরায় পীড়িত হয়েও, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এই সত্যগুলিকে ঘৃণা করে। মানুষ নিজেরই দেহজাত মল, মূত্র, বমি কে ঘৃণা করে। কেউ স্বয়ং এইরকম হয়ে যদি সেই স্বভাবসম্পন্ন অন্যকে ঘৃণা করে সেটা কি আরো হাসির নয় ?? '
এটা শুনেই শ্যামলবাবুর অবস্থা শূলবিদ্ধ হাতির মত হয়ে গেল।
প্রহ্লাদের জন্মের সময় তাদের বাড়িতে এক সাধু এসেছিলেন। ওর মা র আবার সাধুতে খুব ভক্তি ছিল।সাধুকে বাড়িতে তাই সেদিন আশ্রয় দেওয়া হয়। সেই সাধু প্রহ্লাদের হাত দেখে বলেছিলেন এই ছেলে সংসারের কল্যাণ সাধনে জন্মেছে। বলে ছেলের দু'পা ধরে চুম্বন করেছিলেন।
আজ সেই সাধুর কথা মত যদি তার ছেলে বাড়ি ছেড়ে দেয় সেই ভয়ে ঘুম হলনা শ্যামলবাবুর।
পরেরদিন ঠিক করলেন পার্টি দেবেন। পার্টিতে তার যত বন্ধু ছিল আর তাদের বিবাহযোগ্যা মেয়েরা ছিল, তাদের বান্ধবীদের সমেত ডাকলেন। বন্ধুদের সবাইকে ফোনে বললেন তার সমস্যার কথা। বললেন-' যাকে ছেলের পছন্দ হবে তাকেই বউমা করে নেবেন। '
আর এত গুণের অধিকারী আর্থসামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রহ্লাদকে জামাই করতে কে না চাইবে। বন্ধুরা নিজেরাই বলতো শ্যামলবাবুকে। এতদিন উনি নিজেই এড়িয়ে যেতেন। এবার টনক নড়েছে। শ্যামলবাবু বন্ধুদের বললেন, ওরা যেন মেয়েদের আর তার বান্ধবীদের নিয়ে চলে আসেন। তারপর আনন্দ করে তার বাড়িতেই থেকে যায়। শ্যামলবাবু প্রোজেক্টারে সিনেমা দেখাবেন মেয়েদের । বন্ধুদের দায়িত্ব সেই সময় প্রহ্লাদকে বোঝাবেন যে ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার হয়ে তার মুখে এসব মানায় না। এই পৃথিবীটা তার ভোগের জন্য পড়ে রয়েছে। তার ক্ষমতায় সে যা চায় তাই পেতে পারে।
পার্টিতে সব কিছুই ছিল। মদ, মাংস। ছিলনা শুধু প্রহ্লাদ। সে একবার তার বাবাকে জানালো সে রাত করে ঢুকবে। কারণটাও জানা শ্যামলবাবুর। যতটা এড়ানো যায় সবাইকে। যাই হোক, প্রহ্লাদ যখন বাড়িতে ঢুকলো তখন শ্যামলবাবুর বাড়িতে সবার শরীর মন মদাসক্ত। সেই অবস্থাতেই প্রহ্লাদকে ডেকে নিয়ে গেল শ্যামলবাবুর বন্ধুরা অন্য একটা ঘরে। ওদিকে সিনেমা শেষের পথে। মদের নেশায় সবাই একটা বড় ঘরে শয্যাশায়ী। ঘুমের ঘোরে সবাই অবসন্ন।
বন্ধুদের মধ্যে শ্যামলবাবুর একজন ডাক্তার বন্ধু মদের নেশায় জড়ানো স্বরে তার বক্তব্য শুরু করলো।
'দেখো তুমি এখন ইয়ং। এসব চিন্তা হতাশায় আসতেই পারে।তবে একটা সত্যি কথা - বিয়ে করে কোন লাভ নেই। ডাক্তারদের বিয়ে সংসার করা উচিত নয়। আমরা সবাই পস্তাচ্ছি। তার থেকে তুমি কয়েকজন গার্ল্ফ্রেন্ড রেখে দেবে। নার্সিং হোম করবে। মাসে দশ - বারো লাখ ইনকাম না হলে কিসের ডাক্তারি। দামী বাড়ি - গাড়ি তে ঘুরে বেড়াবে। যে গার্ল্ফ্রেন্ডের যখন সময় হবে তার সাথে তখন। লাইফটা এনজয় করার জন্য।'
বাকিরা সবাই তাতে সায় দিল।
এরপর আরো অনেকে এরকম অনেক কিছু বললো। প্রহ্লাদ চুপ করে সবার বক্তব্য শুনতে লাগল। তারপর সবাই যখন সোফাতে, মেঝের দামী কার্পেটে ঘুমিয়ে পড়লো প্রহ্লাদ রুম থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসে দেখল, মাঝের বড় ঘরটায় প্রায় ১৫-১৬ টি মেয়ে মরা কাঠের মত শুয়ে আছে। একজন তার একটি হাতকেই বালিশ বানিয়ে শুয়ে আছে। আর একজনের মাথার চুল খোলা, তার বুকের লজ্জানিবারণের ওড়নাটি বিস্রস্ত। যেন একটি ভোমরা হাস্যময় নদীর জলের ফেনায় গুঞ্জন করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্য একজন কোন পদ্মের মধ্যভাগের মত নরম, উজ্জ্বল হাতদুটো দিয়ে প্রহ্লাদের হরিনাম করার খোলটিকে পাশবালিশের মত জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। কয়েকজন গভীর ঘুমে অবশ হয়ে দামী কার্পেটের উপর শুয়ে যেন কোন হাতির তান্ডবে কিছু গাছের ডালপালা ছিন্ন হয়ে মেঝেতে পড়ে । একজন দরজার কাছে বাঁকা ধনুকের মত শুয়ে। দুতিনজন একে অপরকে জড়িয়ে সোফাতে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে। একজন অত্যাধুনিক ঢিলেঢালা ড্রেস পরে এসেছিল। কিন্তু ঘুমের সময় তার কাঁধ থেকে সেই পোশাক খুলে গেছে। সে তার সেই পোশাকটিকে দুই উরুর মাঝের গহ্বরে নিয়ে ঘুমিয়ে, পোশাকটি যেন তার রতিক্রীড়ার শেষে ক্লান্ত শয্যাসংগী। আর একজনকে দেখে মনে হচ্ছে হাতির আঘাতে কোন স্ত্রী প্রতিমা ভেংগে পড়ে রয়েছে। কয়েকজন ঘুমের মাঝে উৎকট নি:শ্বাস ফেললো আর দুই বাহু ছড়িয়ে হাই তুলতে লাগল। একজনের মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল। গোপন অংগ প্রকাশিত করে সে মদমত্তের মত শুয়ে ছিল।
এভাবে একাধিক শিক্ষিতা আধুনিকাদের মদের প্রভাবে গভীর নিদ্রায় বিভিন্নভাবে দেখে প্রহ্লাদের মনে হল যেন এক হ্রদে প্রবল ঝড়ে কিছু পদ্মদল ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে । দিনের বেলায় এই সুন্দরদেহ আর মধুর বচনের স্নিগ্ধ স্বভাবের নারীতে অনুরক্ত হয় একজন পুরুষ। তারা কেউ এভাবে ভাবেনা তাদের। পার্থক্যটা অনুভব করলো প্রহ্লাদ। শ্যামলবাবুর বুদ্ধি বুমেরাং হয়ে ফিরে এল তার কাছে। মাথায় নানারকমের চিন্তা নিয়ে প্রহ্লাদ তার রুমে ঢুকলো। আজ রাতেই তাকে এই মায়ার সংসার ত্যাগ করতে হবে। তার আগে একবার তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে মনে পড়লো। তখন রাত এগারোটা। ফোন করলো তাকে। ফোন তুললো।
'কি ব্যাপার? ' কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন এল ওই প্রান্ত থেকে।
কয়েক সেকেন্ড কি বলবে বুঝতে পারলো না। মনে হল তাকে আর একবার যদি জড়িয়ে ধরতে পারতো। তারপর বললো -'ঘুমাওনি ? '
পাশ থেকে তার মা চেঁচিয়ে উঠলো।
'কে ফোন করেছে এত রাতে রে '
ফোনটা তড়িঘড়ি কেটে দিল প্রহ্লাদ। ভেবে দেখল এখন ওকে খুব দরকার ছিল। না পেলে প্রহ্লাদ কষ্ট পাবে। আবার ওকে পেতে জোর করলে ওর মা কষ্ট পাবে। এভাবে সংসারের সব কিছুই দু:খের জালে আবদ্ধ। ভাবতে ভাবতে বাথরুমে ঢুকলো। প্রস্রাব করে ফ্লাশ করতে গিয়ে দেখলো একটা আরশোলা বাথরুমের প্যানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে আবার ভাবলো আমি যদি ফ্লাশ করি আরশোলাটা মারা যাবে। না করলে বাথরুমে গন্ধ থেকে যাবে। এরকম ভাবতে ভাবতে সে তার মাথা দুহাতে ধরে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। এই পৃথিবীতে সব কিছুই অনিত্য। সব কিছুই। এর থেকে মুক্তির উপায় কি ? গীতায় বলা আছে আত্মা শরীরধর্মী। তাই দু:খের কারণ এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পেতে আত্মাকেও ত্যাগ করতে হবে। তবেই অহংকারের ত্যাগ হবে। নাহলে সুপ্রিম উইজডম লাভ করা সম্ভব নয়। ইন্দ্রিয়গুলিকে জয় করেও আবার হার স্বীকার করতে হবে।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল প্রহ্লাদ। একটা সাধারণ জামা প্যান্ট পরে আর কিছু টাকা নিয়ে সত্যের সন্ধানে। দুদিন এভাবে যেদিকে দুচোখ যায় চলতে চলতে ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত প্রহ্লাদ একটা গ্রামে এল। সে তার মাথার চুল কামিয়ে ফেলেছে। মুন্ডিতমস্তক প্রহ্লাদের মাথায় তখন স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান লোপ পেয়েছে। সামনে একটা টিউবওয়েলের জল খেলো প্রহ্লাদ। একটা বড় গাছের তলাটা বাঁধানো ছিল। সেখানেই ধ্যানে বসলো। প্রহ্লাদের শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন প্রসন্ন। মনের ভিতর নানারাকম বিতর্ক চলতে লাগলো। এরকম পাঁচ-ছয় দিন থাকার পর প্রহ্লাদের শরীর আরো ভেংগে পড়ল। তার হাতের লাঠিতে ভর করে সে সেই গ্রামে কিছু ভিক্ষার সন্ধানে বেরোল। তার এত কম বয়সে ভিক্ষাবৃত্তি নেওয়াকে আলস্য আর মতিভ্রম বলে বাজারের অনেকে খিল্লি ওড়ালো। সবাই হাসাহাসি করতে লাগল - আমাদের গ্রামে এক ষাঁড় আছে যে খোড়া কিন্তু কাউকে তাড়া করতে গেলে খোড়া থাকেনা আর। এটা নতুন ষাঁড়।
প্রহ্লাদের কানে কিছুই ঢুকলনা। একজন যুবক তাকে একটা এক টাকার কয়েন ছুঁড়ে দিল। প্রহ্লাদ সেটি মাটি থেকে গুড়িয়ে তার হাতে গুঁজে দিল। স্মিত হেসে বললো - শ্রদ্ধয়া দেয়ম্, অশ্রদ্ধয়া অদেয়ম্।
সবার মধ্যে একটা হাসির রোল উঠলো।
এর পর হাটতে হাটতে একটা পুকুরের কাছে এসে আর শরীরে বল পেলনা। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
যখন চোখ খুললো তখন দেখল সে একটা ঘরের বিছানায় শুয়ে। সামনে কয়েকটা মুখ। তার মধ্যে একজন যুবক বলল- আমায় চিনতে পারছেন ডাক্তারসাহাব? আমি মহম্মদ আমীর।
প্রহ্লাদ তাকে দেখে কোন সায় দিলনা।
যুবকটি বলে চলল - 'না চেনারই কথা আপনার। আমার মানিব্যাগ আর মোবাইলটা সেদিন পকেটমারি হয়ে গেছিল। ট্রেনে করে বাড়ি ফিরবো টাকা ছিলনা। সবার কাছে টাকা ভিক্ষা করছিলাম। বি.আর.সিং হসপিটালের সামনে আপনি এলেন। অনেক প্রশ্ন করলেন। আর আমায় একশো টাকা দিয়ে বলেছিলেন, দেখো যুগ যেরকম সেরকম হতে হবে। এই যে দেখো আমি ওই এন.আর.এস এর ডাক্তার কিন্তু আমি মানিব্যাগ ইউজ করিনা। এই পকেটে কিছু টাকা, ওই পকেটে কিছু রেখে দিই, যাতে একটা পকেট কাটা গেলেও চাপ না হয়।'
প্রহ্লাদ বললো - হ্যাঁ মনে পড়েছে।
আমীরের বাড়িতেই প্রহ্লাদের থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। প্রহ্লাদ রোজ ঘুরে ঘুরে বেড়াত লাঠি আর ভিক্ষার ঝুলি হাতে । এসে আমীরের সাথে কোরান নিয়ে আলোচনা করত। নিজে কিছু রান্না করে খেত। ধ্যানে প্রহ্লাদ ডিবেট করতো নিজের সাথে -সব ধর্মের প্রচারক বলে গেছেন তার কথা না মানলে অধ:পাত নিশ্চিত। সেই অতীতে বুদ্ধদেব আর এই কালে রামকৃষ্ণদেব শুধু বলেছেন, তোমার পথ আলাদা হলেও তুমি ভুল নও। সব পথই রোম নগরীর দিকে যায়। পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ কাজ করে একটা রিটার্নের আশা থেকে,স্বার্থ থেকে। বাবা-মা কেউ বাদ যায় না। সেই আশাপূরণ না হলেই মানুষ খারাপ প্রতিপন্ন হয়। অন্যকে খারাপ দেখিয়ে মনে হতাশা আসে। সংসারের অনিত্য থেকে উতপন্ন অশান্তি সবাইকে তাই আধাত্ম্যতৃষ্ণার পথেই নিয়ে যাবে। কাউকে আগে, কাউকে পরে। মানুষ যেই দেখলো কেউ নতুন পথ দেখাচ্ছেন। তাদেরকেই মূর্তি বানিয়ে পূজা করতে লাগলো।
মানুষের মন বড় দুর্বল, ভীরু। সে সবসময় কিছু অবলম্বন চায়। সে তাই চিন্ময়ীকে মৃণ্ময়ীতে খোঁজে। একদিন অশান্ত প্রহ্লাদ কালীমূর্তির সামনে বিষের জ্বালায় যেরকম ছটপট করে সেরকম ছটপট করছিল। কিন্তু তার মৃণ্ময়ী কিছুতেই শান্তি দিতে পারছিল না। তখন এক লাথি মেরে ভেংগে দিয়েছিল। পড়েছিল কিছু মাটির টুকরো।

এভাবে বিতর্ক চলতে লাগলো তার মনে। তার মনে অজস্রচিন্তারাশি কামারের হাতুড়ির মত আঘাত করতে লাগলো। তার মাথায় লাগছিল। চিনচিন করে কানের কাছে শব্দ হচ্ছিল। অনেকক্ষণ বিতর্কের পর তার মনে হল তার মন কামনা আর হিংসা থেকে মুক্ত। এক অনাস্বাদিত আনন্দে সে উদ্বেল হল। তার মনে সন্তুষ্টি এল।
এদিকে শ্যামলবাবু ছেলে নিখোঁজ হওয়ার শোকে বিহ্বল হলেন। সে মোবাইলটাও বাড়িতে রেখে গেছে। যোগাযোগের কোন উপায় নেই। শ্যামলবাবুর স্ত্রী খবর শুনে তার বাড়িতে এলেন। একটা দীর্ঘ বিরহের অবসান হল। তারা ঠিক করলেন ছেলে ফিরে এলে আর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তার এক্স গার্লফ্রেন্ড এর সাথেও তাদের এখন ভালো ভাবে কথা শুরু হয়েছে। বাড়ি ছাড়ার আগে তার সাথেই শেষ যোগাযোগ করেছিল। তাই সেই একমাত্র উপায় ছেলেকে ধরে রাখার। ও ফিরে এলে ওই গার্ল্ফ্রেন্ড সুচরিতার সাথেই বিয়ে দেওয়া হবে।
অগত্যা পেপারে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। ইতিমধ্যে আমীরের চোখে সেই বিজ্ঞাপন পড়েছে। আমীর প্রহ্লাদ যাতে বাড়ি ফিরে যায় সেই উদ্দেশ্যে গোপনে যোগাযোগ করলো শ্যামলবাবুর সাথে। শ্যামলবাবুর চিন্তা হল তিনি নিজে যদি যান ছেলের যা জেদ জোর করে ধরে আনলে, অনিচ্ছা থাকলেও হয়তো ফিরে আসবে,কিন্তু আবার পালাতে পারে। তাই তিনি প্রহ্লাদের এক অনেকদিনের বন্ধু নবারুণ, তার মামা আর তার দুই দাদা কে পাঠালেন। তাদের বললেন ওরা একসাথে গেলেও ও যে ঘরে থাকবে কথা বলতে একসাথে যেন না যায়, একে একে যায়। প্রথমে মামা, তারপর দুই দাদা, তারপর বন্ধু। দরকারে সুচরিতার সাথে কথাও বলানো যেতে পারে যাতে মন গলে। বন্ধু বলল - আপনি কোন চিন্তা করবেন না কাকু, ওর মাথার ভূত তাড়ানোর ওঝা আমি।
প্রথমে মামা গেল তার কাছে।
মামা প্রহ্লাদের বক্তব্য শুনে বলল - তুই দেখ্ এই বসন্তকাল পরিবেশে যে মত্ততা সৃষ্টি করে তা কি শুধু পাখিদের জন্যই ? চিন্তার অযোগ্য বিষয় নিয়ে তুই চিন্তা করছিস। যেগুলো নিয়ে ভাবার সেগুলো নিয়েই ভাবছিস না। তোর চুলের যা অবস্থা অপজিট সেক্স আট্রাক্টেড হবে কি করে ?
প্রহ্লাদ বললো - সবাই একই জিনিস নিয়ে ভাবলে নিউটন ও মাতাল হয়ে লুংগি তুলে হানি সিংর গানে ডিস্কোতে নাচতো। আপেল থেকে অভিকর্ষ আবিষ্কার হতনা।
মামা -
হ্যাঁ কিন্তু অভিকর্ষ নিয়ে না ভেবে নিউটন তো এটা নিয়ে ভাবেন নি, যে আপেল কেন গোল।
প্রহ্লাদ বললো - হ্যাঁ আপেলের সেপ টা কেন আপেলের মত হল এটাও একটা গবেষণার বিষয় বটে।
মামা বুঝলেন, এ রোগ সারানো তার সাধ্যের বাইরে, তাই বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে।
তার দুই দাদা এসে দুই পাশে বসল।
এক দাদা বললো - দেখ্ আমি তোর বন্ধুর মত। অমংগল থেকে নিবৃত্ত করা, মংগলজনক ব্যাপারে গাইড করা আর বিপদে ত্যাগ না করা আমাদের কর্তব্য। বন্ধু হিসেবে বলছি, মেয়েদের প্রতি উদাসীনতা তোর যোগ্য নয়। সৌজন্য আর অনুরাগের সংগে ওদের গ্রহণ করতে হয়। অনেক বাউল রা তো সংসার করে। কিন্তু তারাও দেহতত্ত্বের সাধনা করে। কামই শ্রেষ্ঠ। ইন্দ্রও পরস্ত্রী অহল্যাকে কামনা করেছিলেন। অনুরাগের বশে পরাশর কালীকে সম্ভোগ করেছিলেন। মুনি বশিষ্ঠ রমণের ইচ্ছায় চন্ডালকন্যা অংগমালার সাথে মিলিত হয়েছিলেন। স্ত্রী সংসর্গ প্রাণান্তকারী জেনেও পান্ডু মাদ্রীর সাথে কামজ সুখ ভোগ করেছিলেন। সত্য আপেক্ষিক। এই যে বিশ্বব্রম্ভান্ড এও পরম সত্য নয়। পরম সত্য বলে কিছু নেই। কামই সত্য। এছাড়া আর কোন সত্য নেই। মুনি ঋষি, দেবতা, সবাই, এই জগত কামে অনুরক্ত। আর তুই? হ্যাঁ তোর আগেও, সদ্য একটা রিলেশন কাজ করেনি। অনিচ্ছা আসবে স্বাভাবিক।তা সত্ত্বেও ডেট কর। ছল করেও মেয়ে পটা। দেখবি কাউকে সত্যি ভালো লেগে যাবে।
প্রহ্লাদ বললে - এই জগত অনিত্য। পৃথিবী যদি উলটো দিকে ঘুরত তাহলে সূর্য পশ্চিমদিকে উঠতো। তাই যা কিছু আমরা জানি সবই অনিত্য, পরম সত্য নয়। আমি সেই সত্যের সন্ধান করছি। সাধারণের মতই যাদের পতন হয়, বিষয়ে যাদের আসক্তি রয়েছে কিংবা আত্ম-সংযমের সাথে যাদের যোগ নেই, তাদের মাহাত্ম্য আছে - এরূপ আমি মনে করিনা। তুমি বলছ - ছল করেও মেয়েদের পটিয়ে নিতে। কিন্তু কারো আনুকূল্যের জন্য কোন কপটতা আমি জানিনা। এই জগতকে যেন অগ্নিতে জ্বলন্ত দেখতে পাচ্ছি।
তোমরা এখন যাও। কাল কথা বলবো আবার। এই জগত প্রকৃতই দু:খের। এই দু:খের থেকে মুক্তির উপায় বের করে আমি প্রচার করবো।
এই বলে প্রহ্লাদ সামনের নীমগাছের তলায় ধ্যান করতে গেল। নীমগাছের পাতাগুলো চঞ্চল, মনোহর। সে উপলব্ধি করলো এত বছর ধরে সে মনের শান্তি পেতে যে বিবেকজনিত বিতর্কমূলক ধ্যান করতো তাতে মন যে শান্তি লাভ করতো সেটা আসলে মুক্তি নয়। এতে সন্তুষ্ট হলে চলবেনা। বিতর্ক চিত্তে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তাই এই সমাধি কখনো পরম সত্যর পথে নিয়ে যেতে পারেনা। এতে সন্তুষ্ট হয়ে থাকলে তার শরীরধর্মী আত্মা আবার বিষয়, ইন্ধ্রিয় সুখে আকৃষ্ট হবে। এর উর্ধ্বে তাকে যেতে হবে। পরের দিন সকাল হল। জগতের চক্ষু সূর্য উদিত হল। আর প্রহ্লাদও উদীয়মান সূর্যের মত গাছের তলা থেকে উঠে এল। তার দেহ শীর্ণকায়, কিন্তু চোখে মুখে উজ্জ্বল দীপ্তি। সে বিতর্কহীন ও প্রীতিসুখযুক্ত এক মানসিক অবস্থা লাভ করেছে।
সে তার দুই দাদাকে ডেকে বললে - বাবা-মা কে বলবে শোকাচ্ছন্ন না হতে। জগত থেকে বিচ্ছেদ যখন ধ্রুব সত্য, তখন ধর্মের জন্য নিজেই বিচ্ছেদ ঘটানো সংগত। আমি যে গুণহীন সে কথাও বলবে। গুণহীনতার জন্য লোকে স্নেহ ত্যাগ করে। স্নেহত্যাগ করলে আর শোক আসেনা।
মামা হঠাত রেগে এসে বললো - উচ্ছৃংখল ছেলের মত তুই সবাইকে ত্যাগ করতে পারিসনা।
একজন দাদা মামাকে সামলালো।
প্রহ্লাদ নির্বিকার চিত্তে বললো - বড় কোন প্রশ্নের উত্তর পেতে ত্যাগ তো করতেই হবে।আমি যদি স্নেহের বশে স্বজনকে না ছাড়ি, তাহলে মৃত্যু আমাদের ছাড়িয়ে দেবে। মেঘগুলো যেমন মিলিত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়, বিশাল মহাসমুদ্রে হিমশৈলরা যেরকম, প্রাণীদের মিলন- বিচ্ছেদ ও সেরকম। বাবা-মার সন্তাপের কারণ আমি নই। অজ্ঞানবশত:ই এই দু:খ। গৃহকোণ, বন্ধুর মায়া ছেড়ে আমি মুক্ত - সেই বন্ধনে আমি আর প্রবেশ করতে চাইনা। এই বন্ধন শুধুই দু:খের কারণ। আমরা সবাই কোন না কোন মত, ব্যক্তি, দল, ধর্ম তে বায়াসড্। আমি সব রকম বায়াসনেসের উর্ধ্বে যে সত্য আছে সেই সত্যকে জানতে চাই।
এতক্ষণ নবারুণ চুপ করে সব শুনছিল। সে চালাক ছেলে। জানে কখন কিভাবে কথা বলতে হয়।এবার সে মুখ খুলল -
দেখ্ ভাই, তুই দিন দিন বড় বাল হয়ে যাচ্ছিস। আমরা যে কুল ডিউড রকস্টারকে চিনি, এই কি সেই। আধুনিক চিন্তায় গড়া তুই প্রাচীনকালে ফিরে গেলি। যাই হোক, তোর একটাও কথা অযৌক্তিক নয়, তবে কালোচিতও নয়। রাম ও তার পিতার আদেশ মেনেছিলেন। রাম তার স্ত্রী সীতাকে ত্যাগ করে বনবাসে যায়নি। আগেও জীবনের অনেকগুলো ধাপ ছিল। ব্রম্ভচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস। যে বয়সে যেটা মানায়। তুই বুড়ো হ। ভিক্ষা করে তুই যথাসময়ে ধর্মপালন করবি। যৌবন ধর্ম ও অর্থের শত্রু। ধর্ম যত্নে রক্ষিত হলেও একে ধারণ করা কঠিন। কারণ কামনা বিষয়ভোগের পথে তাকে আকর্ষণ করে। জীর্ণ বয়স বিচার পরায়ণ, ধীর ও স্থিতিশীল। গতি না থাকায় সমাজের কাছে লজ্জায় অল্প যত্নেই শান্ত স্বভাব লাভ করে। তুই যে সবের কথা বলছিস সেগুলো এই চঞ্চল, বিষয়প্রধান, প্রমত্ত, অদূরদর্শী ও বহু ছলনাময় যৌবনে মানায় না।
প্রহ্লাদ এবার কি যেন চিন্তা করে গম্ভীর অথচ শান্ত কন্ঠে বলা শুরু করল - আগুন কাঠে তৃপ্ত হয়না, তৃষ্ণাযুক্ত ব্যক্তির তেমনি বিষয়ভোগে তৃপ্তি নেই। ভোগ্য বিষয়গুলি জগতে অনিত্য। এই সত্যকে জেনে কোন্ জ্ঞানী ব্যাক্তি অনর্থ চাইবে ? দারুণ যত্নে যা পাওয়া যায় আর ক্ষণকালের মধ্যেই তা নষ্ট হয় সবই স্বপ্নলব্ধ ভোগের মত। বিষয় দু:খ প্রতিকারের নিমিত্ত মাত্র। একে 'ভোগ' বলা যায় না। যে বস্তুগুলি প্রথমে সুখ দান করে, সেগুলিই আবার দু:খ বহন করে আনে। সোয়েটার, জ্যাকেট শীতকালে আরামদায়ক, গ্রীষ্মকালে অস্বস্তির কারণ। কেউ একান্তভাবে সুখী বা দুখী নয়। কোন বড়লোক সব সময় হাসেন না, কোন গরীব সব সময় হতাশ হননা। এইসব অনিত্যতার মিশ্রণ দেখে আমার সব মিথ্যা মনে হয়। মুকেশ আম্বানিও একটা বাড়িতেই থাকতে পারে। রাতে যখন সে ঘুমায় সে একটা ঘরই ভোগ করতে পারে। কোন স্বামী তার স্ত্রীর মনের একটা খোপেই স্থান পায়। ডাক্তার হয়ে টাকা ইনকাম করা পরার্থে শ্রম ছাড়া আর কিছু নয়। যা কিছু প্রয়োজনের থেকে বেশি তা কেবল অহংকারের জন্য। কন্টেন্টমেন্ট থাকলে সব কিছুই তুচ্ছ মনে হয়। যে অন্ধ না হয়েও অন্ধ হতে চায়, মুক্ত হয়েও বদ্ধ হতে চায় সেই বিষয়ী হতে ইচ্ছে করে। তুই বললি, বুড়ো হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে। নবীন বয়সে চিত্তের বিকার হয়। এটাও অনিশ্চিত। প্রায়ই দেখা যায় জরায় অধীরতা, যৌবনে ধৈর্য থাকে। যখন মৃত্যু বাচ্চা- বুড়ো সবাইকেই সমান ভাবে ডেকে নেয়, তাহলে একজন জ্ঞানী কিভাবে বার্ধক্যের প্রতীক্ষা করবে ? তুই আমার বন্ধু হয়ে কি করে আমায় উতসাহ না দিয়ে এরকম কথা বলে ডিমোটিভেট করছিস? এই পৃথিবীটা আসলে বন্ধুসুলভ দৈত্যতে পরিপূর্ণ, আর দেবদূতরা ক্ষত নিয়ে।

এতটা বলে প্রহ্লাদ চুপ করল। এর পর কিছু বলা মানে পন্ডশ্রম।
সে রাতে প্রহ্লাদ ধ্যানে বসলো। সে যেন বুঝতে পারলো এটাই মুক্তি নয়। কারণ আজ বিকেলে ফোনে তার মা, সুচরিতার কান্না শুনে তার মন বিষাদগ্রস্ত। সে আরও উচ্চতর স্তরের উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের ঘরের মেঝেতে ধ্যানে বসলো । একের পর এক স্তর অতিক্রম করে প্রহ্লাদ যখন চোখ খুললো তখন সকাল হয়েছে।
শেষ চেষ্টা করার জন্য তার দাদা সুচরিতার সাথে কথা বলালো। আগের দিন আপত্তি করেছিল প্রহ্লাদ তার মনে ভয় ছিল সে গলে যেতে পারে। আজ নির্ভয়ে, নিসংকোচে ফোন কানে নিল প্রহ্লাদ।
ও পাশ থেকে অনেক কান্নাকাটির পর প্রহ্লাদকে নির্বিকার দেখে বললো -তুমি অনেকদিন বলছিলে দেখা করবে। তোমার সাথে অনেক দিন দেখা হয়নি চল দেখা করে আমাদের পুরানো মূহুর্তগুলোতে ফিরে যাই।

প্রহ্লাদ বললো, না আসলে কিছুই নেই। সব কিছুই ভ্রম। ইলিউশন। কিছুই আসলে হচ্ছেনা, সবই ভ্রম।
এরপর একদিন সে আবার বেরোল নিরুদ্দেশের পথে। আমীরের বাড়ি ছেড়ে।
একজায়গায় এসে অসাধারণ শাস্ত্রীয় সংগীত শুনে সে থেমে গেল।
তার এক বছর পরের কথা। একটা স্টেজ। যেখানে প্রহ্লাদ একটা তানপুরা নিয়ে বসে। এক পাশে সেতার বাদক। আর এক পাশে পাখোয়াজ। শোনা যায় প্রহ্লাদ একদিন ঘুরতে ঘুরতে এক সংগীতবিশারদের বাড়িতে উঠেছিল। সেখানে এক বছর শাস্ত্রীয় সংগীত শিখে আজ প্রথম গাইতে উঠেছে। অনেক দর্শকদের মধ্যে একজন শ্যামল বাবু, আর একজন তার বন্ধু
সাইকিয়াট্রিস্ট এবং এক বছর ধরে প্রহ্লাদের চিকিতসক। এক বছর আগে প্রহ্লাদের সিজোফ্রেনিয়া রোগ হয়েছে তিনিই বলেছিলেন। তারপর থেকে তাঁর কাছেই চিকিতসাধীন। আসলে ওই সংগীত বিশারদ আর কেউ না ওই সাইক্রিয়াটিস্ট নিজেই ছিলেন। মঞ্চে প্রহ্লাদ গান ধরে উঠলো- 'মন চল নিজ নিকেতনে।'
সাইক্রিয়াটিস্টের মুখের এক কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। প্রহ্লাদকে বুঝিয়েছিলেন তিনি, তখন - এ সংসারে যারা তৃষ্ণার্ত তাদের জন্য এ সংসারে থেকে তোমার কন্ঠ হতে গানের আলো বিকিরণ হোক। অবসেসন না থাকলেই হল। Desire must be there . Without desire of breathing life doesn't exist . But desire to be harmful and লাক্সারিয়াস হওয়া shouldn't be that path, দ্যাট লিড্স towards supreme wisdom .. নিজের ফুলের সুগন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে দাও।
গান শেষ হল। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি তে ভূষিত করছে গায়ক কে। হাততালি দিতে দিতে পাশে শ্যামলবাবুকে তিনি বললেন - 'কিছু পাগলামি না সারানোই খুব ভালো।'

পাঁচ মিনিট

"বিষ টা খাওয়ার আগে একবার আমাকে বলতো!! " কথাটা শেষ করতে না করতেই গলা ধরে এলো কিরণ এর। হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এর বাইরে ...